
একটি গল্প, যেখানে মৃত্যুই জন্মের পথ তৈরি করে। যেখানে নিঃশ্বাসহীন শরীর বয়ে বেড়ায় হৃদয়ের শব্দ। যেখানে প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র নয়, মমতার বাহক হয়ে ওঠে। ব্রাজিলের ২১ বছর বয়সী তরুণী ফ্রাঙ্কলিম দে সিলভা—যিনি স্ট্রোকে মারা যান, অথচ তার গর্ভে বেড়ে উঠতে থাকে যমজ সন্তান। এই বাস্তব ঘটনাটি চিকিৎসাবিজ্ঞান, মানবতা, এবং নৈতিকতার সীমা ও সংজ্ঞা নতুন করে রচনা করেছে।
২০২৪ সালের জানুয়ারির এক সকালে, সাও পাওলো শহরের প্রান্তে, হঠাৎ মারাত্মক স্ট্রোক করে পড়ে যান ২১ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা ফ্রাঙ্কলিম দে সিলভা। চিকিৎসকরা বলেন—এটি ছিল হেমোরেজিক স্ট্রোক, অর্থাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত বিপর্যয়। হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয় তাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে, দুইজন স্বাধীন নিউরোলজিস্ট ২৪ ঘণ্টার ভেতর ঘোষণা করেন—তিনি মস্তিষ্কমৃত (Brain Dead)।
ব্রেন ডেথ মানে হচ্ছে—শরীরের যত শিরা-উপশিরা সচল থাকুক না কেন, মানুষের চেতনা, অনুভব ও চিন্তার কেন্দ্র সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, এটি আইনগত ও চিকিৎসাগতভাবে মৃত্যু।
কিন্তু চিকিৎসকরা এক অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলেন—ফ্রাঙ্কলিমের গর্ভে থাকা ভ্রূণ দুটির হৃদস্পন্দন তখনো সচল। ৯ সপ্তাহের ভ্রূণ, এখনো অনেকটাই অপরিণত, কিন্তু স্পন্দিত। এই সংকেতই ছিল জীবনের।
ফ্রাঙ্কলিমের পরিবার জানায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সন্তান ধারণের স্বপ্ন দেখছিলেন। চিকিৎসকদের সামনে প্রশ্ন—এই শিশুদের জীবন বাঁচানোর জন্য কি একটি মৃত নারীর দেহকে কৃত্রিমভাবে জীবিত রাখা উচিত? প্রশ্নটা শুধু বৈজ্ঞানিক নয়, নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয়ও।
পরিবার রাজি হয়। চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন—ফ্রাঙ্কলিমের দেহকে লাইফ সাপোর্টে রেখে যমজ ভ্রূণ দুটির যত্ন নেওয়া হবে যতক্ষণ না তারা পৃথিবীতে আসার জন্য প্রস্তুত হয়।
এই সিদ্ধান্তের সাথে সাথে শুরু হয় এক অভিনব যুদ্ধ—একটি মৃত মায়ের গর্ভে জীবন ধরে রাখার যুদ্ধ। একটানা ১২৩ দিন।
এই সময়ে প্রতিদিন তাকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়েছে। চিকিৎসা খরচ ছিল রীতিমতো বিশাল—প্রতিদিনের লাইফ সাপোর্ট, আইসিইউ কেয়ার, ওষুধপত্র ও পরীক্ষার জন্য খরচ হয় প্রায় $১০,০০০ মার্কিন ডলার। সব মিলিয়ে ১২৩ দিনে মোট খরচ দাঁড়ায় $১.২ মিলিয়ন ডলার। এই অর্থের একাংশ বহন করে সরকারি স্বাস্থ্যবীমা, এবং বাকি অংশ আসে দাতব্য সংস্থা ও নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত দানের মাধ্যমে।
সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন—এই খরচে তো ১০০+ শিশুর জীবন বাঁচানো যেত! তবে সমর্থকেরা বলেন, “প্রতিটি জীবনই অমূল্য, বিশেষ করে যে জীবন এখনও পৃথিবীর আলো দেখেনি।”
১২৩ দিন পর, ৩২ সপ্তাহ গর্ভকাল পূর্ণ হলে চিকিৎসকেরা প্রস্তুতি নেন। দুটি শিশু জন্ম নেয়—একটি মেয়ে, ১.৪ কেজি ওজন; একটি ছেলে, ১.৩ কেজি। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই NICU-তে স্থানান্তর করা হয়। ফ্রাঙ্কলিমের শরীর তখনো শুয়ে আছে অপারেশন টেবিলে—নিঃস্পন্দ, নিঃশ্বাসহীন, কিন্তু তার ভেতর থেকে উঠে এসেছে দুটি নতুন প্রাণ। শিশুদের জন্মের কয়েক ঘণ্টা পর, লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিবার তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্রাঙ্কলিমকে শেষ বিদায় জানায়। তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গও দান করা হয় অন্য রোগীদের বাঁচাতে। মৃত শরীরের প্রতিটি অংশে ছিল জীবনের স্পর্শ। এ যেন শুধু একটি জন্ম নয়, এক মায়ের আত্মদান, এক সভ্যতার বিবেক।
আজ সেই যমজ দুটি শিশু জীবিত, হাসিখুশি। তাদের নাম রাখা হয়েছে Asaph (ছেলে) এবং Anna Vitoria (মেয়ে)। তাদের ভালোবাসায় ভরা দাদা-দাদির কোলে বড় হচ্ছে। হয়তো একদিন তারা জানবে, তাদের মা মরে গিয়েও কিভাবে তাদের পৃথিবীতে আসার পথ তৈরি করে গেছেন।
এই কাহিনির প্রতিটি স্পন্দন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাতৃত্ব কখনো মরে না, এমনকি মৃত্যুর মধ্যেও নয়।
জয় হোক বিজ্ঞানের, জয় হোক মানবিকতার।
তথ্যসূত্র: NZ Herald (17 July 2024)









