
ডেনমার্কের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত শহর আরহুস—যার নামের সঙ্গে উচ্চারণে লেগে থাকে সাগরের হিমশীতল ঢেউ আর উত্তর বাতাসের দীর্ঘশ্বাস। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার হৃদয়ে, এ শহর যেন অতীত ও আধুনিকতার সমান্তরাল দুটি রেখা। ইতিহাসে একদা এই শহর ছিল ভাইকিংদের ঘাঁটি, আজ তা প্রযুক্তি, শিল্প ও অভিবাসনের এক বৈচিত্র্যময় কেন্দ্র।
আরহুস বন্দর, ডেনমার্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম, দিনরাত ধরে গ্রহণ করে সারা পৃথিবী থেকে আসা কন্টেইনারশিপ। আর তার পাশ ঘেঁষে শহরের বুক জুড়ে ছড়িয়ে আছে নর্ডিক স্থাপত্যের নিটোল সৌন্দর্য। খালপাড়ে শাদা হাঁসেরা ঘুরে বেড়ায়, আর শহরের কেন্দ্রস্থলে ক্যাথেড্রালের ঘণ্টা ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় গির্জা থেকে লাইব্রেরির দেয়াল পর্যন্ত।
এই শহরের বাইরে, উপশহর ব্রাব্রান্ড (Brabrand) আরহুসের পশ্চিম অংশে অবস্থিত এক নীরব এলাকা। এখানে বসবাস করে মূলত মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসী পরিবার।
বাংলাদেশিরাও এখানে গড়ে তুলেছে এক ছোট্ট কমিউনিটি। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা কিংবা নোয়াখালীর মানুষ এখানে এসে মসজিদ বানিয়েছেন, গ্রোসারি দোকান খুলেছেন, কেউ কেউ ট্যাক্সি চালান, কেউ রেষ্টুরেন্টে কাজ করেন। সপ্তাহান্তে ছোটখাটো পুনর্মিলনী, উৎসবে আনন্দে গান-বাজনা, সব মিলিয়ে এক টুকরো বাংলাদেশ যেন ইউরোপের মাটিতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
ব্রাব্রান্ডের এক পুরনো তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন এক তরুণী। প্রথম দেখায় তাকে কেউ আলাদা করে চিনত না। সুপারমার্কেটে মাঝেমধ্যে তাকে দেখা যেত, বা স্কুল থেকে ফেরার সময় সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন—তার গায়ের পোশাকে ছিল ধর্মের শালীনতা, মুখে ছিল নীরবতা, কিন্তু তার চোখে ছিল বিস্ময় আর চাপা কান্না। মেয়েটি এক অভিবাসী পরিবারের শিশুকন্যা—যে বেড়ে উঠেছে দুটি সংস্কৃতির ভেতর।
মেয়েটির জীবনে এই দ্বন্দ্ব ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। সে জন্মেছিল এক এমন সমাজে, যেখানে মুক্তি চাওয়ার অধিকার ছিল সীমিত, আর ভালোবাসার ব্যাখ্যা ছিল নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গাঁথা। তার অভ্যন্তরে চলছিল এক অদৃশ্য লড়াই—নিজের জন্য, নিজের অস্তিত্বের জন্য।
এই সমাজেরই অদৃশ্য গহীনে ধীরে ধীরে জমা হচ্ছিল ক্ষোভের ছাই। শহরের রুক্ষ কুয়াশা, অভিবাসী পাড়ার আড়ষ্ট নীরবতা আর সংস্কৃতির নামে চাপা পড়া ক্রোধের মধ্যেই একদিন অকালে হারিয়ে গেল মেয়েটি। যেন অন্ধকার ঘরে কেউ অস্পষ্ট একটি নিশ্বাস ফেলল – আর ততক্ষণে নিভে গেল তার জীবনের আলো। কেউ কিছু বলার আগেই, বুঝে ওঠার আগেই, শুধু অবিশ্বাস আর একটিই অমীমাংসিত প্রশ্নে ভারী হয়ে উঠল বাতাস: কেন?
মিতা বেগম। বয়স মাত্র ২৪। সিলেটের এক রক্ষণশীল পরিবার থেকে তার বাবা-মা আশির দশকে ডেনমার্কে এসেছিলেন। এখানেই বেড়ে ওঠা মিতার। সে এক হাতে ধরেছিল ইউরোপের চেতনা—ব্যক্তিস্বাধীনতা, নারীর অধিকার; আর অন্য হাতে ছিল পারিবারিক শেকড়—সংযম, নিঃশব্দতা, ও আনুগত্য।
১৮ বছর বয়সে, আশরাফ হোসেন নামে এক আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। মিতার অনিচ্ছায় সই দেয়া বিবাহপত্র তখন ছিল ‘সম্মানের চুক্তি’, যেন এক রাজনৈতিক বোঝাপড়া দুই পরিবারের মধ্যকার।
বিয়ের পর থেকেই আশরাফ হয়ে ওঠেন একেবারে নিয়ন্ত্রণকারী। মিতাকে বাইরে কাজ করতে দেয়া হতো না। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা নিষিদ্ধ। ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। শ্বশুর আব্দুল করিম ও দেবর ইসমাইলের কথা ছিল চূড়ান্ত নির্দেশের মতো।
২০১৪ সালে একবার সাহস করে মিতা স্থানীয় পুলিশে একটি ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স রিপোর্ট করেন। কিন্তু পরিবারের চাপে সেই অভিযোগ তিনি তুলে নেন।
২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মিতা আনুষ্ঠানিকভাবে ডিভোর্সের আবেদন করেন। সেই সিদ্ধান্ত যেন এক টর্নেডোর মতো আছড়ে পড়ে তার স্বামীর পরিবারে। সমাজে “ইজ্জতের” ভয়, পরিচিত মহলে “বেইজ্জতি”—এইসব পুরুষতান্ত্রিক ভয়ের জাল বুনে হত্যা করার ছক তৈরি করে আশরাফ, তার বাবা ও ভাই। ডিভোর্স মানেই “পরিবারের অপমান”—এমন ধারণা নিয়েই শুরু হয় এক নির্মম ষড়যন্ত্র।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। বিকেলের পর, সন্ধ্যা নামার আগেই—বাথরুমে আটকে রাখা হয় মিতাকে। প্রথমে ওষুধ খাইয়ে অজ্ঞান করা হয় তাকে। এরপর একটি ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। তার চিৎকার দেয়াল ছুঁয়ে ফিরে আসে। ঘরের ভিতর ছিল জমাট নীরবতা, আর বাইরে ছিল শীতের বরফ-ঠান্ডা বাতাস।
লাশ রাখা হয় একটি লাল রঙের বড় স্যুটকেসে। পরিকল্পনা ছিল, তা গাড়িতে তুলে শহরের বাইরে ফেলে দেয়া হবে। গাড়ি ভাড়া করাও হয়ে গিয়েছিল।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আশরাফ ও ইসমাইল একটি বড় স্যুটকেস বহন করছে। গাড়ি ভাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মী জানায়, তারা অস্থিরভাবে গাড়ির তথ্য চাইছিল। ফরেনসিক পরীক্ষায় স্যুটকেসে থেকে মিতার রক্ত শনাক্ত হয়।
আরহুস কোর্টে বিচার শুরু হয় মার্চ মাসে। বিচারক লিসবেথ ফ্রাইজ-ম্যাডসেনের আদালতে তিন সপ্তাহে ৩২ জন সাক্ষ্য দেন। স্বামী ও শ্বশুরের বক্তব্য একাধিকবার পাল্টে যায়। আদালতে প্রমাণ হয়, হত্যার ছক অন্তত দুই সপ্তাহ আগে কষা হয়েছিল।
আদালত আশরাফ হোসেনকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে (ডেনমার্কে আজীবন কারাদণ্ড বলতে সাধারণত ১৬ বছর বোঝায়) এছাড়া শ্বশুর আব্দুল করিমকে ১৪ বছর, ও দেবর ইসমাইলকে ৬ বছর (অপরাধ গোপনে সহায়তা) কারাদণ্ড দেয়া হয়। তিনজনকেই সাজাভোগ শেষে ডেনমার্ক থেকে ডিপোর্ট করা হবে বলে রায় দেন বিচারক। ক্ষতিপূরণ হিসেবে মিতার পরিবারকে ২৫০,০০০ ডেনিশ ক্রোনার (প্রায় ৩৭ লক্ষ টাকা) দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়।
(সংযুক্ত মিতা বেগমের কল্পিত ছবি)









