সম্পাদকের পাতা

সৌজন্যের অন্তরালে

নজরুল মিন্টো

উত্তর আমেরিকার নাগরিকদের মুখে হাসির আলো ঝলমল করে। আলাপচারিতায় থাকে অমায়িকতার মিষ্টি সুর। কিন্তু এই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অন্য এক ভাষা—হতে পারে অভিনয় কিংবা মৃদু বিদ্রূপ ও পরিহাসের অনুচ্চারিত শব্দ। যে ভাষা হৃদয় নয়, কেবল মুখই বলে। সমাজের অলিখিত নিয়ম মানতে গিয়ে তারা সবসময় মুখে রাখেন অম্লান হাসি।

আমার এক কানাডিয়ান বন্ধু একদিন আমাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিল। অবাক করার মতো বিষয় বটে! উত্তর আমেরিকায় ‘সারকাজম’ (Sarcasm) বাংলায় যার অর্থ বক্রোক্তি বা তীব্র ব্যঙ্গ—খুবই চলে।

যেমন, কারও জন্মদিনে আপনি একটি উপহার দিলেন। উপহারটি যার জন্য, সেটি তার মোটেই পছন্দ হয়নি। তবুও সে বলে উঠলো, “গ্রেট! ওয়ান্ডারফুল!” অথচ মনে মনে বললো, “ছোটলোক কোথাকার, আর কিছুই পেলে না দিতে?” সৌজন্যের দেশে সব শব্দই যেন মধুময়। ‘গ্রেট’, ‘ফ্যান্টাস্টিক’, ‘অ্যামেজিং’ শব্দগুলো প্রজাপতির মতো বাতাসে ওড়ে। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বেরিয়ে আসে নিখুঁত ব্যঙ্গের তীক্ষ্ণ তীর।

এ সমাজে সরাসরি নেতিবাচক কথা কেউ বলে না। যেমন, আপনার সন্তান স্কুলে খুব খারাপ ফলাফল করেছে। শিক্ষক কিন্তু মোটেই বলবেন না যে ছাত্রটি খারাপ করেছে। বরং বলবেন—‘ডেভেলপিং’, ‘ইমপ্রুভিং’। এখানে প্রশংসাগুলো বরফের মতো। দেখতে সুন্দর, ধরতে মসৃণ। কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে থাকে শীতল রহস্য।

আপনার চাকরি হবে না বা কোম্পানিতে ভ্যাকেন্সি নেই। তবুও বলবে—”রিজ্যুমিটা রেখে যান, পরে যখন নিয়োগ দেব তখন আপনার কথা অবশ্যই বিবেচনা করবো।” অথবা বলবে—”আপনার যোগ্যতা আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি!” আর মনে মনে বলবে, “আস্ত একটা ছাগল!”

আপনার চেহারা তেমন সুন্দর নয়। আপনি নিজেও জানেন সেটা। কিন্তু পথে-ঘাটে এমন লোক পাবেন, যে বলবে, “তোমার চেহারা কত মিষ্টি! (How sweet you are!)” আপনার মুখে ধন্যবাদ শুনেই সে মনে মনে বলবে, “যা, আয়নায় গিয়ে নিজের চেহারাটা দেখে আয়!”

খাবার খেয়ে বমি আসার উপক্রম কিন্তু দেখবেন কোনো এক অতিথি এসে হোস্টকে বলবে- “ইন্টারেস্টিং টেস্ট! এমন খাবার আগে কখনো খাইনি!” আর মনে মনে বলবে জীবনে যেনো এ মহিলার হাতের রান্না আল্লাহ না খাওয়ান।

বিগ বসকে বিদায় সংবর্ধনায় কলিগেরা বললো, “স্যার, আপনার অভাব আমরা প্রতিদিন অনুভব করবো!” আর মনে মনে বলে “ব্যাটা, বড্ড জ্বালিয়েছিস,  তুই না থাকায় এখন অফিসটা আনন্দে ভরে থাকবে!”

উত্তর আমেরিকায় বয়স্কদেরও ‘ইয়াং ম্যান’ বলা হয়। আমাদের সত্তরোর্ধ্ব সামাদ আলীকে কেউ এই শব্দে ডাকলে তিনি উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠে কি করতেন কল্পনা করতে পারছি না। তিনি বুঝতেনই না যে এটি প্রশংসা নয়, নিছক ঠাট্টা।

কোনটা বিদ্রূপ, কোনটা পরিহাস এটা যদি না বুঝেন তাহলে বলার কিছু নেই। উত্তর আমেরিকায় সবাই কমবেশি অভিনয়শিল্পী। প্রশংসার মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাতে ফুল নিয়ে, মুখে হাসি নিয়ে, হৃদয়ের কথা নয়—বলে মঞ্চের সংলাপ।

আমাদের বাঙালি সমাজে একটু অতিরঞ্জন বা ‘চাপা’ প্রবণতা বেশি। আমরা যা নই, তার চেয়ে বেশি না বললে শান্তি পাই না। “কী ছিলাম!”—এ বাক্যের দীর্ঘশ্বাসের ওজন কয়েক মেট্রিক টন। কেউ কবি, কেউ সাহিত্যিক, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ রাজনীতিবিদ। আবার এমনও দেখা যায় যে, একজনই একাধারে সবকিছু। চাপার জোরে অনেকেই সমাজে নিজের যোগ্যতার চেয়ে বড় আসনে বসে যান। ধরা পড়লে মান-সম্মান শেষ হয়ে যাবে এটা তারা কেয়ার করেন না। তারা মনে করেন ‘চাপার জোর, বড় জোর’। অবশ্য যারা সত্যিই সম্মানিত, তারা ‘চাপা’ মারতে যান না। তবে কিছু কিছু পেশায় এই প্রবণতা বেশি—যেমন উকিল, দালাল, আদম ব্যাপারী, ট্রাভেল এজেন্ট। এদের পেশাই হচ্ছে চাপা মারা (সবাইকে ঢালাওভাবে ট্যাগ করছি না)।

কিছু কিছু মহিলা গল্পে অতিরঞ্জন করতে সীমা ছাড়িয়ে যান। একবার পার্কে দুই মহিলা গল্প করছেন। প্রথম মহিলা বলতে শুরু করলেন দেশে তিনি কীভাবে রানীর মতো থাকতেন! তার মুখের কথা মুখে থাকতেই অন্য মহিলা কেড়ে নিয়ে বললেন, “জানেন আপা, উত্তরায় আমার বিশাল বাড়ি ছিল। বারান্দায় দু’দুটো গাড়ি!” মহিলা চলে যাওয়ার পর পাশে থাকা ছোট্ট মেয়েটি মাকে জিজ্ঞেস করলো, “মা, উত্তরায় আমাদের কোথায় বাড়ি ছিল?” মা ধমকের সুরে বললেন, “চুপ থাক! ওরা কী উত্তরায় গিয়ে দেখবে নাকি আমাদের বাড়ি আছে কি নেই!”

প্রিয় পাঠক, এবার থেকে কেউ আপনার প্রশংসা করলে খুব বেশি গদগদ হবেন না। আর হ্যাঁ, চাপা মারলেও হিসেব রাখবেন যেন কারো প্রশ্নের মুখে আবার বিপদে না পড়েন!


Back to top button
🌐 Read in Your Language