২০২৫ সালের কানাডার নির্বাচন: সংকট, প্রত্যাবর্তন ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
নজরুল মিন্টো

আসন্ন কানাডার ফেডারেল নির্বাচন একটি নাটকীয় মোড় নিয়েছে। সর্বশেষ জরিপে দেখা যাচ্ছে মার্ক কার্নির নেতৃত্বে লিবারেল পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে।
কানাডার ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচন যেন এক উন্মুখ জাতির গল্প। যেখানে প্রতিটি জনপদ, প্রতিটি করিডোরের বাতাসে বইছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বৈশ্বিক মন্দার ছোঁয়া, অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক চাপ, আন্তর্জাতিক রাজনীতির টানাপোড়েন এই বহুমুখী চাপের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে কানাডার রাজনৈতিক মঞ্চ। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক নির্বাচন বিশ্লেষকদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েছে লিবারেলদের ঘুরে দাঁড়ানো এবং কনজারভেটিভদের অন্তর্গত ভুলগুলোর দিকে।
সর্বশেষ জরিপ: পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত
২০২৫ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে পরিচালিত সর্বশেষ ইউগভ জরিপে লিবারেল পার্টি ৪৩% এবং কনজারভেটিভ পার্টি ৩৯% ভোট পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। লিবারেলরা ১৮২টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের পথে রয়েছে। অন্যদিকে, এনডিপি ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করতে যাচ্ছে, মাত্র ৪টি আসন পেতে পারে, এবং ব্লক কিউবেকোয়া ২৩টি আসনে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস।
(তথ্যসূত্র: yougov.co.uk)
পটভূমি: টালমাটাল রাজনীতি ও নেতৃত্বের পরিবর্তন
২০১৫ সালে বিপুল জনপ্রিয়তা নিয়ে জাস্টিন ট্রুডো ক্ষমতায় এলেও, এক দশকের ব্যবধানে লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। ২০২৪ সালের উপনির্বাচনে একাধিক পরাজয়, ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আবাসন সংকট জনগণের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম দেয়। এ অবস্থায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রুডো পদত্যাগ করেন এবং মার্চে সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর মার্ক কার্নি লিবারেল পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে পার্টি এক নতুন গতিপথ পায়।
কনজারভেটিভ পার্টির ভুল: বিজয়ের সম্ভাবনা নিজেরাই বিনষ্ট করল
কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিভরের প্রচারণা শুরু থেকেই ট্রাম্পিয়ান ঢঙে পরিচালিত হয়। “Axe The Tax” এবং “Defund the CBC” শ্লোগানগুলি পার্টির মূল ঘাঁটিতে সাড়া ফেললেও, কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মধ্যপন্থী ভোটারদের বিচলিত করে। ‘Freedom Convoy’ আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনও অনেককে দূরে সরিয়ে দেয়।
ইমিগ্রেশন নীতিতে কনজারভেটিভদের কঠোর অবস্থান; স্থায়ী অভিবাসন কমানো, অস্থায়ী কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস; ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও তরুণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে।
গাজা ইস্যুতে তাদের নিরবতা মুসলিম ও মানবাধিকার সচেতন অংশের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। আর ট্রাম্পের প্রতি নরম মনোভাব ও কৌশলী দূরত্ব রাখার ব্যর্থতা জাতীয়তাবাদী আবেগের ভোটারদের মনোজগতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
লিবারেল পার্টির ঘুরে দাঁড়ানোর রহস্য
ট্রুডোর উত্তরসূরি হিসেবে মার্ক কার্নির আবির্ভাব যেন সময়ের দাবি ছিল। ব্যাংক অব কানাডা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক গভর্নরের আর্থিক দূরদর্শিতা এবং স্থির নেতৃত্ব জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনে। ট্রুডোর কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে দূরত্ব তৈরি করে কার্নি লিবারেলদের ব্র্যান্ড নতুনভাবে নির্মাণ করেন; স্থিতিশীলতা, বাস্তববাদ এবং দায়িত্ববোধের বার্তা দিয়ে।
ইমিগ্রেশন নীতিতে তারা একদিকে জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার, অন্যদিকে দক্ষ পেশাজীবী ও আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের নীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখে। “Global Skills Strategy” পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে তরুণ ও ব্যবসায়িক ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া জাগায়।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে লিবারেলদের মানবিক অবস্থান, স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান ও গাজার পুনর্গঠনে সহায়তার প্রতিশ্রুতি বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর প্রশংসা পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানাডাবিরোধী বাণিজ্য নীতি ও মন্তব্য কানাডার জাতীয়তাবাদী অনুভূতিকে উসকে দেয়। ট্রাম্পের “কানাডাকে ৫১তম রাজ্য বানানোর” মন্তব্য লিবারেলদের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ায়। কার্নি এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ:
নতুন সরকারকে একাধিক গুরুতর সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে: বাড়ির দাম ও অপ্রাপ্যতা, খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য, অপরাধ বৃদ্ধির প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ট্রাম্পীয় নীতির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব।
বিশ্লেষকদের মতে, কার্নির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এই সংকটগুলোর বাস্তব সমাধান খুঁজে বের করা, এবং জনগণের পুনরুদ্ধারকৃত আস্থা বজায় রাখা।
২০২৫ সালের নির্বাচন কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। মার্ক কার্নির নেতৃত্বে লিবারেল পার্টির পুনরুত্থান এবং ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ এই নির্বাচনের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। আগামী দিনে কানাডার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য নতুন সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে।









