
রোচডেল। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এক নাতিদীর্ঘ শহর, যেখানে প্রাচীন মিল কারখানার ধুলোমাখা দেয়াল আজ ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। শহরটির বুক চিরে বয়ে চলেছে রোচ নদী, আর তার পাড়ঘেঁষে গড়ে উঠেছে সাজানো-গোছানো ইটের বাড়ি, পুরনো টেরেস হাউস, ছোটখাটো বাজার। শীতকাল এলে এখানকার আকাশ যেন সারাদিন ছাইরঙা থাকে, দুপুরে সূর্য দেখা না গেলেও বাতাসে থাকে পাইন গাছের হালকা গন্ধ।
এই শহরের প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি গলিতে আপনি খুঁজে পাবেন এক খণ্ড বাংলাদেশ। বিশেষ করে সিলেটি মানুষের পদচারণায় শহরটি যেন হয়ে উঠেছে এক প্রবাসী গ্রাম। পানের দোকান থেকে শুরু করে তন্দুরি রেস্টুরেন্ট, হালাল মিট শপ থেকে শুরু করে ট্রাভেল এজেন্সি—সব জায়গায়ই বাংলা শব্দ মিশে গেছে ইংরেজি রাস্তার নামের সাথে।
রোচডেলের বাংলাদেশি কমিউনিটি মূলত গড়ে উঠেছে ১৯৭০-এর দশক থেকে। প্রথম দিকে এসেছিলেন টেক্সটাইল মিলে কাজ করতে, তারপর পরিবার নিয়ে এসেছেন। আজ এই কমিউনিটির বেশিরভাগই সিলেট, বিশ্বনাথ, জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের মানুষ। অনেকেই দীর্ঘদিনের নাগরিক, কেউ কেউ ব্রিটিশ সংসদ সদস্য বা কাউন্সিলরও হয়েছেন।
তবে অধিকাংশ মানুষ এখনো নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনযাপন করেন। অনেকে ট্যাক্সি চালান, কেউ কেউ রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করেন, কেউ ডেলিভারি বা কনভিনিয়েন্স শপে কাজ করেন। নারীরা কেউ কেউ স্কুলে খাবার সরবরাহ করেন বা নার্সিং হোমে খণ্ডকালীন কাজ করেন। পুরুষরা বেশি রাত পর্যন্ত খাটেন, সকালে বেরিয়ে পড়েন, বাসায় ফেরেন প্রায় মধ্যরাতে। কষ্ট হলেও এদের মুখে হাসি থাকে, কারণ তারা জানেন—এই পরিশ্রমই একদিন তাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের ভিত রচনা করবে।
কিন্তু নতুন প্রজন্ম অনেকটা বিচ্ছিন্ন। তারা ব্রিটিশ সমাজের ভেতর বেড়ে উঠেছে, বাংলা ঠিকঠাক বলতে পারে না, অনেকেই পিতৃভূমির ইতিহাস জানে না। অনেকে কখনো বাংলাদেশে যায়নি, শুধু গল্প শুনে শুনে তাদের কল্পনায় আঁকে সেই দেশ।
রোচডেলে বাংলাদেশিদের পরিচালনায় বেশ কিছু মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদ শুধু নামাজের জায়গা নয়, বরং সামাজিক মিলনমেলার কেন্দ্র। এখানে আলোচনা হয় দেশ নিয়ে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, কখনো কখনো ধর্মীয় মতপার্থক্য নিয়েও।

এই শহরের জালালিয়া মসজিদের পাশে হাঁটলে মাঝে মধ্যে শোনা যেত একটি নরম গলার কোরআন তেলাওয়াত—যেন সূর্যাস্তের আলোয় মিশে যেত সে সুর। সেই সুরের মালিক, কারি সাহেব, ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। নাম ছিল জালাল উদ্দিন। দেশের বাড়ি সিলেট বিভাগের বিশ্বনাথ উপজেলায়। স্ত্রী-সন্তানদের রেখে এসেছিলেন পনেরো বছর আগে যুক্তরাজ্যে। প্রথমে ছিলেন টেম্পোরারি ইমাম, পরে স্থায়ী হলেন রোচডেলের প্রবাসী মুসলিমদের হৃদয়ের কেন্দ্রে।
২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, সন্ধ্যার পরের সময়টা ছিল খুবই শান্ত। শিশুরা তখনও খেলার মাঠে দৌড়াচ্ছে। কেউ বাসার পথে হাঁটছে। আর একজন মানুষ—৭১ বছরের কারি সাহেব—হেঁটে ফিরছিলেন নামাজ পড়ে। সোজা পথে যাবার কথা থাকলেও সেদিন তিনি একটু চক্রপথ ধরেছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটবেন, প্রিয় সৃষ্টিকর্তার কিছু আয়াত মনে আনবেন। কিন্তু তিনি ভাবতে পারেননি কেউ তাকে ওত পেতে অনুসরণ করছিল—মাসের পর মাস।
মোহাম্মদ সায়েদি এবং মোহাম্মদ কাদির নামের দুই তরুণ। একজন ছিল গাড়িচালক, অন্যজন ঘাতক। একজন প্রাক্তন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্টুয়ার্ড, অন্যজন জন লুইস কল সেন্টারের কর্মী। তারা বিশ্বাস করত কারি সাহেব কালো জাদু জানেন। তিনি যে “তাবিজ” দেন, এ তাবিজ হলো ‘কালো জাদু’। তাদের মতে, ইসলাম এ জিনিস সমর্থন করে না, এবং এর শাস্তি মৃত্যু।
প্লেগ্রাউন্ডের মধ্যে গিয়েই কাদির পিছন থেকে একের পর এক হাতুড়ির আঘাতে জালাল উদ্দিনকে মাটিতে ফেলে দেয়। কোনো আত্মরক্ষা করার সময় পাননি তিনি। গড়াতে গড়াতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ।
সায়েদি তখন গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। হত্যার পর কাদির গাড়িতে উঠে বসে এবং তারা চলে যায়। যে ফোনে তারা এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল, সেই ফোনেই পরে পাওয়া যায় ভয়াবহ দৃশ্য—মৃত্যুর ভিডিও, আইএস-এর পতাকা, বোমা তৈরির নির্দেশিকা।
এই হত্যাকাণ্ডের মূল প্রেক্ষাপট ছিল ধর্মীয় মতপার্থক্য এবং উগ্রবাদী চিন্তাধারার প্রভাব। সায়েদি এবং কাদির বিশ্বাস করত যে, জালাল উদ্দিনের রুকইয়াহ বা তাবিজ চর্চা ইসলামবিরোধী এবং এর জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। এই ধারণা জন্ম নিয়েছিল ইসলামিক স্টেট নামধারী সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রচারণায়, যার ভিডিও, সাহিত্য, এবং জিহাদি চেতনায় মোহিত হয়ে উঠেছিল এ দুই তরুণ। এই বিকৃত বিশ্বাসেই তারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।
সায়েদিকে গ্রেফতার করা হয় পাঁচ দিনের মধ্যে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার বিরুদ্ধে রায় হয়—জীবনভর কারাদণ্ড, অন্তত ২৪ বছর জেলে থাকতে হবে।
কাদির পালিয়ে যায়। ধারণা করা হয়, তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় ঢুকে সে আইএস-এ যোগ দেয়। তৃতীয় একজন, মোহাম্মদ সায়াদুল হুসাইন, তাকে দেশ ছাড়তে সাহায্য করেছিল—তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয় ২০১৭ সালে।
বিচারক স্যার ডেভিড ম্যাডিসন বলেন, “এটি ছিল একটি পরিকল্পিত, ঠাণ্ডা মাথার, বিদ্বেষপ্রসূত হত্যাকাণ্ড।”
জালাল উদ্দিন ছিলেন সাত সন্তানের জনক। তিনি যুক্তরাজ্যে একাই বসবাস করতেন এবং তার স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনিরা বাংলাদেশে অবস্থান করতেন। হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন ১৫ বছর পর বাংলাদেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে দেখা করার। তার ছেলে সালা আল-আরিফ আদালতে বলেন, “তিনি শুধু আমাদের বাবা ছিলেন না, ছিলেন আলোর বাতিঘর। শান্তিপূর্ণ, সকল ধর্মকে শ্রদ্ধা করা মানুষ। অথচ তাকে হত্যা করা হলো ধর্মের নামে, আইএস-এর নাম ভাঙিয়ে।”
হত্যাকান্ডে জড়িত মোহাম্মদ সায়েদি এবং মোহাম্মদ আব্দুল কাদির—দুজনেই যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তাদের পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। রোচডেল এবং ওল্ডহ্যামে বসবাসকারী এই তরুণদ্বয়ের পরিবার বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত হয়েছিল।
এই দুই ব্যক্তি ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য, ইমাম জালাল উদ্দিনকে হত্যা করে। তাদের এই কর্মকাণ্ড যুক্তরাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে।
রোচডেলের মসজিদ এখনো আছে। নামাজ হয়, কুরআন পাঠ হয়। শিশুদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় সুরা ফাতিহা। তবে সেই কারি সাহেব আর নেই। তার কোমল কণ্ঠের মধুর তেলাওয়াত আর ধ্বনিত হয় না মসজিদের দেয়ালে।









