সম্পাদকের পাতা

এক জোড়া জুতার জন্য তিনটি লাশ

নজরুল মিন্টো

শারজাহ। আরব উপদ্বীপের পূর্ব প্রান্তে, উপসাগরের তীরে গড়ে ওঠা এক নিস্তব্ধ, সুপরিকল্পিত শহর। যেখানে সন্ধ্যাবেলায় ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো পড়ে থাকে পিচঢালা রাস্তায়, আর শীতকালের সকালের হালকা কুয়াশা যেন ঢাকা দেয় পরিশ্রমে নুয়ে পড়া শহরের ক্লান্তি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি আমিরাতের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটি তার নিজস্ব সৌন্দর্যে স্বতন্ত্র।

শহরটিতে রয়েছে প্রচুর কল-কারখানা। বিভিন্ন দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে ছুটে এসেছে কাজের সন্ধানে, উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে। গঠিত হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া। আর এসব এরিয়াকে ঘিরে তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের বিশাল বিশাল একেকটি ঘাঁটি। এসব ঘাঁটিতে বসবাস করে হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক। বেশিরভাগই ভারতীয়, পাকিস্তানী ও বাংলাদেশি।

এখানে প্রতিটি ভবন যেন একটি পৃথক পৃথিবী—প্রত্যেক কামরায় ৮ থেকে ১২ জন পুরুষ, কেউ নবাগত, কেউ পুরনো রুটিনে ক্লান্ত, কেউবা দেশে ফেরার অপেক্ষায় অস্থির। থাকে একটা ছোট রান্নাঘর, একটি মাত্র বাথরুম। একই বারান্দায় শুকায় জামা, একই চুলায় ফুটে ভাত। মনে হয় যেনো একান্নবর্তী একটি পরিবার।

এই শ্রমিকরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করে। কেউ নির্মাণস্থলে ইট টানে, কেউ পিচ গলায়, কেউ ওয়ার্কশপে ওয়েল্ডিং করে, কেউ বর্জ্য পরিষ্কারের ট্রাক চালায়। তাঁদের জীবনে আছে অবিরাম ক্লান্তি, কিন্তু তার মাঝেও বেঁচে থাকার এক অব্যক্ত দৃঢ়তা। তারা স্বপ্ন দেখে। তাদের পরিবার নিয়ে সে সব স্বপ্ন। মায়ের চিকিৎসা, ছেলের স্কুল, বোনের বিয়ে, ঘরের চাল ঠিক করতে করতে তাদের ৪/৫ বছর কোনদিক দিয়ে কেটে যায় কেউ টেরই পায় না।

২০১৪ সালের ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টা। ক্যাম্পের কক্ষ নং ১৬৫। হঠাৎ করে এ ঘরে শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। কারণ ছিল এক জোড়া ‘সেফটি শু’। কেউ একজন পরেছিল অন্যজনের জুতা। এ নিয়ে তুমুল তর্ক। শব্দে শব্দে আগুন ছড়ায়। গালাগাল পেরিয়ে ধাক্কাধাক্কি, তারপর এক পর্যায়ে রান্নাঘরের ধারালো ছুরি এসে যায় হাতের মুঠোয়। এবং তারপর যা হয়, তা গল্প নয়, লেখা হলো এক রক্তাক্ত ইতিহাস।

ছুরিকাঘাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আজাদ রহমান (২৫), দুলাল হোসেন (২৬) ও সাইফুল ইসলাম (২৮)। তাঁদের বুকে এবং পিঠে একাধিকবার ছুরিকাঘাত করা হয়। আহত হন আরও তিন বাংলাদেশি—আব্দুস সালাম, সাদ্দাম হোসেন ও নাজমুল হক। মেঝেতে রক্ত গড়িয়ে পড়ে রান্নাঘরের দরজা পেরিয়ে ঘরের মাঝখান পর্যন্ত।

শারজাহ পুলিশ রাত দুইটার দিকে পৌঁছে আসে এবং ঘটনাস্থলে প্রচুর রক্ত, ছিন্নভিন্ন কাপড় এবং আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে দুইজনকে গ্রেফতার করে—সুহেল আহমদ ও মিনহাজুল ইসলাম।

দুজনই বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাসিন্দা। তদন্তে উঠে আসে, এই দুই ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিল। তবে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, ছুরি চালানো ব্যক্তি—জাকির হোসেন (২৪), বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে—ঘটনার পরে রাতেই পালিয়ে যায়। সে পাকিস্তানি এক শ্রমিকের সহায়তায় ক্যম্প ছাড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ছেড়ে বাহরাইন চলে যায় বলে সন্দেহ করা হয়। হত্যাকারী আজও পলাতক। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্টারপোলের তালিকায় তার নাম রয়েছে, তবে সে এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতে গ্রেফতারকৃত সুহেল আহমদ-কে এক বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় মারধরের জন্য। মিনহাজুল ইসলাম-কে ছয় মাসের জেল দেওয়া হয় সংঘর্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণের দায়ে। আরেকজন অভিযুক্ত—রাশেদ মিয়া (২৮), কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বাসিন্দা—যে হত্যাকাণ্ডের পরেও পুলিশকে তথ্য দেয়নি এবং পলাতক খুনিকে পালাতে সাহায্য করেছিল, তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

নিহতদের পরিচয়:

আজাদ রহমান (২৫): কুমিল্লার দেবিদ্বার থেকে এসেছিলেন। কনস্ট্রাকশন হেল্পার হিসেবে কাজ করতেন। তিন বছর ধরে প্রবাসে, পরিবারে বৃদ্ধ মা-বাবা, একমাত্র ছোট বোনের বিয়ের জন্য টাকা জমাচ্ছিলেন।

দুলাল হোসেন (২৬): কুমিল্লার লাকসামের যুবক। মিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন। সেই সন্তানের মুখ তিনি দেখেননি।

সাইফুল ইসলাম (২৮): ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বাসিন্দা। ক্যাম্পের মেইনটেন্যান্স ডিপার্টমেন্টে ছিলেন। বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা, দুই ছোট ভাই, এবং একটি অন্ধ বড়বোন।

প্লাস্টিকে মোড়ানো কফিনে নিহতদের লাশ পাঠানো হয় দেশে। স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা মিলে একটি সংগঠন করে লাশ পাঠানোর খরচ এবং দাফনের ব্যয়ভার বহন করেছিলেন।

এই ঘটনার খবর মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সংবাদমাধ্যম—Gulf News, Khaleej Times, Al Arabiya—সব জায়গায় প্রকাশিত হয়। শিরোনাম হয়: “Bangladeshi workers kill 3 over shoe fight”। জাতির সম্মান যেন এক জোড়া জুতার নিচে পদদলিত হয়।

এ ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর বাংলাদেশ কমিউনিটি হতভম্ব হয়ে যায়। বাংলাদেশিরা লজ্জায় মুখ ঢাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাত্র ৪০ দিরহামের একজোড়া জুতো নিয়ে তিনটি খুন! জাতির সকল অর্জণ ম্লান করে দিলো কয়েকটি মানুষ নামের পশু।

প্রবাসে শ্রমিকের জীবন চরম পরিশ্রমে ভরা হলেও নিরাপত্তা, সম্মান ও সহনশীলতার জায়গায় আজও আমরা ব্যর্থ। এ ঘটনায় বিশ্ববাসীর কাছে গোটা বাংলাদেশিদের তুলে ধরা হলো হীনমন্য, সহিংস ও আত্মমর্যাদাহীন একটি জাতি হিসেবে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language