সম্পাদকের পাতা

নববর্ষে ফেঞ্চুগঞ্জের চড়ক মেলায়

নজরুল মিন্টো

ফেঞ্চুগঞ্জের আকাশটা আজ যেন একটু ভিন্ন রকম। বিকেলের দিকে, যখন গোধূলির নরম আলো কুশিয়ারার জলরেখায় ধীরে ধীরে মিশে যায়, তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এক উৎসবের আবহ। ঢাকঢোলের গগনবিদারী শব্দে মনে হলো—গোটা এলাকা যেন জেগে উঠেছে এক বর্ণময় সংস্কৃতি ও সংহতির মিলনমেলায়।

আজ ছিলো ১লা বৈশাখ। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। আবার পঞ্জিকা অনুযায়ী আজই ছিলো চৈত্র সংক্রান্তি। এ উপলক্ষে আমার বাড়ির পাশে আয়োজন করা হয় বিরাট এক মেলার। বিশাল এক উৎসবের। ফেঞ্চুগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও চড়ক মেলা। মেলায় উপস্থিত হয়ে আমি ফিরে গিয়েছিলাম আমার শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম পুরোনো উৎসব এই ফেঞ্চুগঞ্জের চড়ক পূজা। এখানে ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ নেই—শিশু-কিশোর, যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ সকলে মিলেই রচনা করেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক সম্মিলন।

দিনের আলো ম্লান হতেই ঐতিহ্যবাহী এ মেলা প্রাঙ্গনে ভিড় করেছে হাজার হাজার মানুষ। শাড়ির রঙে রঙিন নারী, নানান রঙে পাঞ্জাবি পরা পুরুষ, হাতে বেলুন ধরা শিশু, কৌতূহলী কিশোর, মেলার সাজে সজ্জিত কিশোরী তরুণী—সবার মুখে উৎসবের হাসি। কেউ আনন্দে লাফাচ্ছে, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে, কেউ লাইভ দিচ্ছে ফেসবুকে।

বাংলার লোকজ ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব চড়ক পূজা বা চৈত্র সংক্রান্তি। বৈশাখ মাসের শুরুতে অথবা বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিন, ১৩ অথবা ১৪ এপ্রিল দিনটি উদযাপিত হয়। এটি মূলত উপাসনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা লোকাচার, আচার, এবং উৎসবমুখর সংস্কৃতি। বাংলাদেশের খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, দিনাজপুর, এবং সিলেট অঞ্চলে এই পূজা এখনো ব্যাপকভাবে পালিত হয়।

চড়ক পূজার মূল আকর্ষণ হলো চড়ক গাছ ও ঘূর্ণন। পূজার মূল অংশে থাকে একটি উঁচু খুঁটি বা খাম্বা (যাকে চড়ক গাছ বলা হয়)। সেই খাম্বার মাথায় ঘূর্ণনযন্ত্রের সাহায্যে কয়েকজন কিশোর সন্ন্যাসী ঝুলে পড়েন যাদের পিঠে গেঁথে দেওয়া হয় লোহার কাঁটা বা বড়শি। তাদের দোলানো হয় বিভিন্ন দিকে, যা চড়ক পূজার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং চিত্তাকর্ষক অংশ।

অনেকের মতে চড়ক পূজা একটি ঋতু পরিবর্তনের পূজা—খরা থেকে বর্ষা, পুরনো বছরের দুঃখ থেকে নতুন বছরের আশাবাদ। এটি মঙ্গল কামনা ও বৃষ্টি প্রার্থনার উৎসব হিসেবেও বিবেচিত।

পূজার সঙ্গে থাকে চড়ক মেলা, যেখানে থাকে: নাচ-গান, পুতুলনাচ, খেলনা, মিষ্টান্ন, লাঠিখেলা। কোথাও কোথাও যাত্রাপালা কিংবা পালাগানও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

ধারণা করা হয়, এই পূজা ১৪শ বা ১৫শ শতকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শুরু হয়েছিল। পৌরাণিক ব্যাখ্যা যাই থাক, আজকের আধুনিক যুগেও এই উৎসব প্রমাণ করে গ্রামীণ বাংলার সংস্কৃতি কতোটা গভীর, বৈচিত্র্যময় এবং ঐতিহ্যবাহী


Back to top button
🌐 Read in Your Language