
এক বিশাল স্বপ্নযাত্রার নাম কানাডার রেলওয়ে। বিস্তীর্ণ প্রেইরি, তুষার-ঢাকা পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল আর শত নদী-পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলে গর্বিত ট্রেনের কাফেলা। কানাডার রেলওয়ে কেবল এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার মাধ্যম নয়; এ এক অনুভবের নাম।
আর এই অনুভবের গভীরতর উপলব্ধি হলো আমার নিজের যাত্রায়—টরন্টো থেকে ভ্যাঙ্কুভার VIA Rail-এর ‘The Canadian’ ট্রেনে। কয়েক বছর আগে আমি বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম রেলপথের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য একটি টিকেট কাটলাম। চার দিন চার রাতের এই যাত্রা আমাকে শুধু ভ্যাঙ্কুভারে নিয়ে যায়নি, বরং নিয়ে গেছে কানাডার হৃদয়ে।
টরন্টোর ইউনিয়ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ট্রেনটি যেন অপেক্ষায়—কত শত জীবনের গল্প বহন করে এগিয়ে চলবে। ট্রেনের দরজায় পা রেখেই এক ট্রেনের ক্রু মহিলা হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। ভিতরে ঢুকতেই এক নতুন জগত: ঝকঝকে সিলভার ইন্টেরিয়র, ছিমছাম কেবিন, আরামদায়ক সোফা আর জানালার পাশে পর্দা সরিয়ে তাকালেই শহরের বিদায়ী আলো।
আমার টিকিট ছিল Sleeper Plus Class-এ। এটা একটি প্রিমিয়াম সেবা, যা দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রায় যাত্রীদের আরামদায়ক ও বিলাসবহুল অভিজ্ঞতা প্রদান করে। এখানে ছিল একজন যাত্রীর জন্য প্রাইভেট কেবিন, যেটা দিনে বসার জন্য চেয়ার এবং রাতে শোবার জন্য বিছানায় রূপান্তরিত হয়। নিজস্ব বাথরুম, শাওয়ারের ব্যবস্থা, আর ব্যক্তিগত অ্যাটেনডেন্ট। মনে হলো যেন কোনো হোটেল নয়, এক চলন্ত প্রাসাদে উঠেছি।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ট্রেনের লাউঞ্জে গেলাম। মৃদু আলোয় হালকা জ্যাজ সংগীত চলছিলো। সহযাত্রীদের—কেউ বই পড়ছেন, কেউ ল্যাপটপে ব্যস্ত আছেন। আমার পাশেই বসা এক দম্পতি এসেছেন নোভাস্কোশিয়া থেকে, তারা বললেন, “প্রতি বছর আমরা রেলভ্রমণ করে থাকি—এটা আমাদের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে।” এক জাপানি বয়স্ক যাত্রী ছোট ছোট নোট নিচ্ছিলেন জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে। তিনি রেলপথ নিয়ে গবেষণা করেন। আমি এক কাপ ক্যাপুচিনো নিয়ে বসে থাকলাম জানালার পাশে। বাইরে তখন ধীরে ধীরে তুষারপাত শুরু হয়েছে। ঝকঝকে রূপালি আলোয় সাদা হয়ে গেছে কানাডার প্রেইরি।
নিজের কেবিনে ফিরে দেখি বিছানা রেডি করা। নরম বালিশ, পরিপাটি চাদর। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম—দূরে দূরে আলো, পাহাড়ের ছায়া, আর ট্রেনের ঝমঝম শব্দ। এরপর নিদ্রার রাজ্যে হারিয়ে যাই।
সকালে ঘুম ভাঙতেই জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। লেক, বনে ঘেরা উপত্যকা, হরিণের পাল, মাঝে মাঝে হিমবাহের ঢেউ। সকালের নাশতায় এল তাজা ফল, পেস্ট্রি, স্ক্র্যাম্বলড এগস, এবং গরম কফি।
যাত্রাপথে ট্রেন মাঝে মাঝে কিছু কিছু ষ্টেশনে থামছিলো। এসব স্টেশনে কিছু যাত্রী নেমে যাচ্ছেন, কেউ কেউ নতুন করে উঠছেন। ম্যানিটোবা অঞ্চলে এক দম্পতির সঙ্গে পরিচয় হলো যারা তাদের হানিমুনে বেরিয়েছেন।

একজন ক্রু আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন Observation Dome-এ। সেখানে কাঁচঘেরা এক লাউঞ্জ—চারপাশ দেখা যায় অসাধারণভাবে। রকি মাউন্টেনসের পথে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ। শীতল বাতাস আর তুষারের মায়াজালে মোড়া সেই দৃশ্য যেন স্বর্গীয়।
এদিকে দিনে দিনে বদলাতে থাকল খাবারের মেনু। রেস্টুরেন্ট কারটি ছিল চমৎকারভাবে সজ্জিত। প্রতি রাতেই থাকত ছোট্ট পারফরম্যান্স—কখনো গান, আবার কোনো দিন সিনেমা শো।
চতুর্থ দিনের বিকেলে ট্রেন পৌঁছায় ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়। রকি মাউন্টেনের শীতলতর অন্ধকার গলে যায় পশ্চিমের সূর্যালোকে। ধীরে ধীরে কাছে আসে ভ্যাঙ্কুভার নগরী।
আমি জানালার পাশে বসে শেষবারের মতো তাকাই, দেখি সেদিনকার সূর্য ডুবে যাচ্ছে প্যাসিফিকের দিকে, আর ট্রেন তার শেষ বাঁকটি নিচ্ছে।

টরন্টো থেকে ভ্যাঙ্কুভার—এটাই কানাডার সবচেয়ে দীর্ঘ ট্রেনযাত্রা। কিন্তু এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। এক রেল কর্মকর্তা বলেছিলেন, “কানাডাকে জানতে হলে এই ট্রেনে একবার চড়ে বসতেই হবে।” প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর এই যাত্রা যেন কানাডার এক চলন্ত চিত্রপট।
এবার জেনে নিন কানাডার রেল সম্পর্কিত কিছু তথ্য:
কানাডাতে প্রথম রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয় ৩১ জুলাই ১৮৩৬ সালে, কুইবেক প্রদেশের মাত্র ৮০ কিলোমিটার রেললাইন দিয়ে। এরপর ১৮৫৪ সালে অন্টারিওতে গ্রেট ওয়েস্টার্ন কোম্পানি নায়াগ্রা জলপ্রপাত থেকে উইন্ডসর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ সম্পন্ন করে।
১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া কনফেডারেশনে যোগদানের শর্তে রেলপথ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলে কানাডার রেল যোগাযোগে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কানাডিয়ান পেসিফিক রেলওয়ে (CPR)—সেই সময়ের বিশ্বের দীর্ঘতম রেলপথ।
ব্যক্তিমালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠান দেশের পূর্ব-পশ্চিম সংযোগের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর ১৯১৯ সালে সরকার প্রতিষ্ঠা করে কানাডিয়ান ন্যাশনাল রেলওয়ে (CN Rail), একটি সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে সিএন-এর নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে দীর্ঘ রেলপথ—৫০ হাজার কিলোমিটার।

শুরু থেকেই যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো ছিল অলাভজনক। ফলে ১৯৭৭ সালে সরকার গঠন করে VIA Rail Canada—শুধুমাত্র যাত্রীসেবার জন্য একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। যদিও রেললাইনগুলোর মালিকানা রয়ে যায় CN ও CPR-এর হাতে।
১৯৮৩-৮৪ সালের শীতে যাত্রীসংখ্যা হঠাৎ কমে গেলে এবং ট্রেন চলাচলে অনিয়ম দেখা দিলে ভিআইএর ভবিষ্যৎ সংকটে পড়ে। অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে গিয়ে সরকার ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের কথাও বিবেচনায় নেয়। সে বছর তাদের বার্ষিক লোকসান ছিল ৫৬১ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩৫০ মিলিয়ন। ফলে ভিআইএ বাধ্য হয় সেবা সংকোচন করতে: ট্রেন সংখ্যা ৪০৫ থেকে নামিয়ে আনা হয় ১৯১-এ এবং ছাঁটাই করা হয় হাজার হাজার কর্মী।
বর্তমানে ভিআইএ রেল সপ্তাহে প্রায় ৪৮০টিরও বেশি ট্রেন চালায় ১৪ হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত নেটওয়ার্কে। কুইবেক থেকে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, গ্রেট লেকস থেকে হাডসন বে পর্যন্ত রেলযোগাযোগ রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৪ মিলিয়নেরও বেশি যাত্রী ভিআইএ-র সেবা গ্রহণ করে।
‘Corridor Project’ বর্তমানে আলোচনার শীর্ষে—এই প্রকল্পের লক্ষ্য, কুইবেক সিটি থেকে টরন্টো পর্যন্ত উচ্চগতির ট্রেন চালু করা। ইতোমধ্যে অনেক ট্রেনে ই-টিকিটিং, ইন্টারনেট সংযোগ, এবং বেল কানাডার সৌজন্যে প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু হয়েছে।

কিছু অজানা বিস্ময়:
VIA Rail-এর কিছু রুটে চাইলে পুরো ট্রেন বা কম্পার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়া যায়—জন্মদিন বা আনন্দ ভ্রমণের জন্য।
শীতে রকি মাউন্টেন অঞ্চলে প্ল্যাটফর্মে স্নোশ্যু পরে ট্রেনে উঠতে হয়।
‘The Canadian’ রুটের Prestige Sleeper Class-এ কেউ কেউ $10,000 পর্যন্ত খরচ করেন, যেখানে থাকে ব্যক্তিগত স্টুয়ার্ডসহ বিলাসবহুল সেবা।
ট্রেন থেকে মাঝেমধ্যে দেখা মেলে হরিণ, হিমবাহ, এমনকি ভালুকেরও!
অন্টারিওর ব্রুকভিল-এ অবস্থিত কানাডার সবচেয়ে পুরনো সক্রিয় রেল স্টেশন, যা চালু আছে ১৮৫৬ সাল থেকে।
সেবার নানা চমক
ভিআইএ রেল প্রতি মৌসুমেই নতুন নতুন অফার দেয়। কখনো ‘একজন যাত্রীর সঙ্গে শিশু ফ্রি’, কখনো ‘দুই যাত্রীর সঙ্গে একজন ফ্রি’। আবার গ্রুপ টিকিটও পাওয়া যায়, যেখানে কেউ চাইলে পুরো কম্পার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে গান, সিনেমা আর নিজস্ব খাবারের ব্যবস্থাসহ আনন্দ ভ্রমণ করতে পারেন।
কানাডায় ট্রেনযাত্রা আরামদায়ক, দৃশ্যত আনন্দদায়ক। দিনের বেলায় ভ্রমণ করলে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়, এবং খাবারের ব্যবস্থা থাকে বিমানের মতোই। ইকোনমি ক্লাসে খাবার কিনতে হয়, তবে অগ্রিম টিকিট কাটলে সাশ্রয় হয় অনেকটাই।
কানাডার রেল একটি অনুভব, এক অপার বিস্ময়, সময়ের ধারাবাহিকতা। ট্রেনের জানালায় বসে কানাডার প্রকৃতি ও সমাজকে যে গভীরভাবে ছুঁয়ে দেখা যায়, তা আর কোনো বাহনে সম্ভব নয়। এই যাত্রা শুধু শারীরিক নয়, আত্মিক।
যে কেউ একবার টরন্টো থেকে ভ্যাঙ্কুভার অবধি রেলপথে যাত্রা করলে অনুভব করবে—এ যেন এক জীবনের দ্বিতীয় পাঠশালা। কানাডা যদি একটি কবিতা হয়, তবে তার ছন্দগুলো বয়ে চলে রেলের লাইনে। রেল কখনো ক্লান্ত হয় না, থামে না, হারিয়ে যায় না—তাই তো আজও রেলের ছন্দে কানাডা নিত্য রঙে রাঙে।









