
ঢাকা, ৬ জানুয়ারি- মহাখালীতে স্বাস্থ্য ভবন নির্মাণে প্রথম ধাপের ২৯ শতাংশ কাজ করেই শতভাগ বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অবশিষ্ট ৭১ ভাগ কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এইচইডি)।
এই ভবন নির্মাণের প্রথম ধাপে ৮৬৬ ধরনের কাজের জন্য মেসার্স বিবি অ্যান্ড ইউসিসি (জয়েন্ট ভেঞ্চার-জেভি) ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু দৃশ্যমান অবকাঠামোর ৬০৩ ধরনের কাজও করেনি তারা। খোদ এইচইডির তদন্তে এমন ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে কোনো অনিয়ম হয়নি
জানা গেছে, পূর্ত, সেনিটারি ও পানি সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি এবং আনুষঙ্গিক কাজে সর্বনিু দরদাতা হিসেবে ৩৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার কার্যাদেশ পায় মেসার্স বিবি অ্যান্ড ইউসিসি। এরপর চুক্তিভুক্ত ২৫৩ ধরনের কাজ করেই শতভাগ বিল তুলে নেয়। অর্থাৎ তারা মাত্র ২৯ শতাংশ কাজ করেছে। অথচ পুরো বিল প্রায় ৩৪ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে।
এইচইডির এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, তদন্তের পর পুরো বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে গেছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেসব আইটেমের কাজ বাকি ছিল সেগুলো আলাদা দরপত্র আহ্বান করে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানো হয়েছে। সেখানে এইচইডির অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
আরও পড়ুন : ডিবি মহিউদ্দিন আতঙ্কের আরেক নাম
স্বাস্থ্য ভবন নির্মাণের প্রথম ধাপের কাজে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে এইচইডি। কমিটির প্রধান করা হয় তৎকালীন এইচইডির সার্কেল-৩ রাজশাহীর (বগুড়া) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিয়াউল হককে।
এই কমিটির অন্য দুজন সদস্য হলেন এইচইডির ঢাকা বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার আলী এবং এইচইডির প্রধান কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী প্রকৌশলী হামিদুল হক খান। প্রায় দুই মাস কাজ করে ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিল করেন। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ঘেঁটে ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য পায়।
তদন্ত কমিটির সদস্য আনোয়ার আলী যুগান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়গুলো তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনিয়মের বিষয়গুলো শতভাগ সঠিক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবন পরিদর্শনকালে দেখা গেছে, বেজমেন্ট-১, বেজমেন্ট-২, বেজমেন্ট-৩ এবং ৩য় ও ৪র্থ তলায় আরসিসি ওয়াল, কলাম, বিম ও ছাদের কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
চুক্তি অনুযায়ী পূর্তের ২৫৭টি কাজ, সেনিটারি ও পানি সরবরাহে ৬০টি কাজ, অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিকে ৫৫টি কাজ এবং ২১টি আনুষঙ্গিক ৪৯৪টি কাজসহ মোট ৮৬৬টি কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে চুক্তি অনুযায়ী মাত্র ২৫৩টি কাজ হয়েছে। এর মধ্যে পূর্তে ১৭১টি, সেনিটারি ও পানি সরবরাহে ৪১টি, অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিকে ৫১টি কাজ হয়েছে। এর বাইরে চুক্তিবহির্ভূত ১৭টি কাজ বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। চুক্তিভুক্ত ৬০৩টি কাজ করাই হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য ভবন নির্মাণে প্রথম ধাপের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বিবি অ্যান্ড ইউসিসি জয়েন্ট ভেঞ্চারের প্রকৌশলী জয়দেব কর্মকার এ প্রতিবেদককে বলেন, ওই ভবনে ৮০০’র বেশি কাজই তো নেই। ভবন নির্মাণে এত কাজ হয়ও না। কাজ কম করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ ঠিক নয়। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবন নির্মাণে প্রথম ধাপের কাজের দরপত্রে সর্বনিু দরদাতা হওয়ায় বিবি অ্যান্ড ইউসিসির (জেবি) অনুকূলে ২০১০ সালের ২৪ জুন ৩৩ কোটি ৯২ লাখ ১১ হাজার ৮৯১ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১১ সালে। ২০ তলা ভবন নির্মাণে এখন দ্বিতীয় ধাপের কাজ চলমান।
এইচইডির প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (যুগ্মসচিব) একেএম আমিনুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, এ বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। তখন আমি দায়িত্বে ছিলাম না।
৩৭ কাজের পরিমাপে ২ কোটি ২৯ লাখ টাকার গরমিল : তদন্ত কমিটি অনুমোদিত নকশা ও সম্পাদিত কাজ অনুযায়ী ৩৭টির পরিমাপ করা হয়। চলতি বিলে এসব কাজে উল্লিখিত পরিমাণের সঙ্গে কমিটি তুলনা করে বড়ো ধরনের গরমিল পেয়েছে। ৩৭টি কাজে মোট ২ কোটি ২৯ লাখ ৮ হাজার ৮৯৩ টাকার পরিমাপ বেশি দেখানো হয়েছে।
এর মধ্যে গ্রাউন্ড ফ্লোরে মার্বেল স্টোন না বসিয়ে ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৩৪৫ টাকার বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। প্লাস্টারে ফোম ল্যাব ব্যবহারে ৭৭ হাজার ৬০০ টাকার চুক্তি হলেও ১১ লাখ ১৭ হাজার ৫১৪ টাকার পরিমাপ দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এক্ষেত্রে চুক্তির চেয়ে ১৪ গুণ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। মাটি সরানোর কাজে ৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়। অথচ বিলে দেখানো হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৩২০ টাকা, যা চুক্তিমূল্যের চেয়ে ১৫ গুণের বেশি। বেজমেন্ট-১, ২ ও ৩-এ ডায়াপগ্রামওয়ালের ওয়াল থিকনেস পরিমাপে বেশি দেখানো হয়েছে। এভাবে ১৩ লাখ ৪ হাজার ৭৬৫ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।
স্ট্রাকচারাল ফোমিংয়ে জালিয়াতি করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৩০ টাকা বেশি বিল গ্রহণ করেছে। বেজমেন্ট-১, ২ ও ৩-এ ওয়ালের উচ্চতা বেশি দেখানোসহ অন্যান্য কাজে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৪০ টাকা বেশি বিল উত্তোলন করেছে। বেজমেন্ট-৩-এ রড ব্যবহারে বাজারদরের চেয়ে বেশি টাকা ধরে বিল করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭১ লাখ ৭৯ হাজার ২৮০ টাকা বেশি বিল তুলে নিয়েছে।
চুক্তিভুক্ত ৬০৩টি কাজ চার কোটি টাকায় সম্পন্ন করা যেত। এসব কাজ এখন বাস্তবায়ন করতে গেলে ৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবশিষ্ট এই কাজ করতে পরে অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
সূত্র: যুগান্তর
আর/০৮:১৪/৬ জানুয়ারি









