মুক্তমঞ্চ

সুবর্ণজয়ন্তীর সূচনায় শতবার্ষিকীর প্রতিজ্ঞা

সৈয়দ আবুল মকসুদ

রাত পোহালেই ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও স্বাধীনতার ৫০তম বছরে পদার্পণ করবে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকে যখন দেশ নানা রকম সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, ভাবতাম যদি স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পর্যন্ত বাঁচি, দেখব এক অন্য রকম নতুন বাংলাদেশ: অপেক্ষাকৃত উন্নত ও সমৃদ্ধ। কিন্তু দুর্ভাগ্য, অল্প দিন পরেই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা-রাষ্ট্রপতি নিহত হন, দেশ পাকিস্তানি ধরনের সামরিক শাসনে চলে যায়। মূল সংবিধানের নীতি-আদর্শ থেকে অন্যদিকে সরে যায় দেশ। অর্থনৈতিক অগ্রগতি থেমে না থাকলেও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি নষ্ট হয়ে যায়।

যেকোনো দেশের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন সময়সাপেক্ষ। সে জন্য সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও জনগণের ত্যাগের মনোবৃত্তি। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ যেমন ত্যাগ স্বীকার করেছিল, স্বাধীনতার পরও কিছুকাল কোনো প্রাপ্তির আশা না করে দেশ গঠনে আত্মত্যাগ প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের অধিপতি শ্রেণি অতি দ্রুত অতি বেশি প্রাপ্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মধ্যবিত্তের একটি গোত্র ভোগবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তার ফলে দুর্নীতির বিস্তার ঘটতে থাকে।

বাহাত্তরে বঙ্গবন্ধুর সরকার সংসদীয় পদ্ধতির যে সংবিধান প্রণয়ন করে, তার চার মূলনীতিতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছিল, ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’ পৃথিবীর উদার গণতান্ত্রিক সংবিধানগুলোর একটি ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক সরকার অনেকবার সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করেছে।

আরও পড়ুন ::

পাঁচ দশকেও বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতি বিকশিত হতে না পারার কারণ শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব। সরকারি ও বিরোধী পক্ষে সুসংগঠিত গণভিত্তিক দল না থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না। ৩৮ বছর ধরে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো ক্যারিশমাটিক জননেতা নেই।

৫০ বছর একটি জাতির জীবনে দীর্ঘ সময় যেমন নয়, তেমনি খুব কম সময়ও নয়। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের আকারে ছোট হতে পারে, কিন্তু জনসংখ্যার বিচারে কোনো ছোট দেশ নয়। তা ছাড়া বাঙালি জাতির রয়েছে দুই-আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস। সেই জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সুবর্ণজয়ন্তী যথাযথ মর্যাদায় উদ্‌যাপনের জন্য যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ, তেমনি উপলক্ষটি আত্মজিজ্ঞাসারও। ৫০ বছরের অর্জন—সাফল্য ও ব্যর্থতা নির্মোহভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা না হলে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ দুরূহ হবে।

মূল সংবিধানে যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা রক্ষায় আমরা কতটা আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছি, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। স্বাধীনতার পর নতুন গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশ ঘটেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগেরই তরুণ নেতা-কর্মীরা প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। তাঁরা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানও দেন। অল্প দিনের মধ্যে অনেকটা জনসমর্থনও অর্জন করে দলটি। কিন্তু প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে এবং হঠকারিতায় দলটি যে শুধু নিজেরই ধ্বংস ডেকে আনে তা-ই নয়, সামগ্রিকভাবে সংসদীয় রাজনীতির পথটাই কর্দমাক্ত করে। না হলো দেশে সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন, না হলো টেকসই সংসদীয় গণতন্ত্র।

সামরিক শাসনের সময় বাংলাদেশ মধ্য বাম থেকে মধ্য ডানে সরে গেল। সত্তরের শেষ দিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয় সামরিক শাসকদের আনুকূল্যে। ওই দলের নেতৃত্বে ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ব্যক্তিরাই। রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে দলটি জনপ্রিয়তাও অর্জন করে। কিন্তু ভবিষ্যতে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাংলাদেশ গঠন করার নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচি তার ছিল না। আরেক সামরিক শাসক গঠন করেন জাতীয় পার্টি। এটি আর এক ধাপ বেশি ডানপন্থী। এসব দলের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ আনুকূল্যে দেশে উত্থান ঘটে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী ইসলামি মৌলবাদী শক্তির। সমাজের হাজার বছরের সমন্বিত অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পাঁচ দশকেও বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনীতি বিকশিত হতে না পারার কারণ শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব। সরকারি ও বিরোধী পক্ষে সুসংগঠিত গণভিত্তিক দল না থাকলে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় না। ৩৮ বছর ধরে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া ছাড়া কোনো ক্যারিশমাটিক জননেতা নেই।

রাজনৈতিক দলের দুর্বলতা দক্ষ আমলারা অনেকটা কাটাতে পারেন। সৎ ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন সে রকম কর্মকর্তারও অভাব। দায়িত্বজ্ঞানহীন দলীয়করণের ফলে সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে থাকেন।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্বশাসিত সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান থাকে। বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু সেসব প্রতিষ্ঠান তাদের স্বকীয় সত্তা হারিয়ে ফেলেছে। নির্বাহী বিভাগের চাপে অন্য যেকোনো সরকারি অফিসের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও সরকারি দপ্তর মাত্র। নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা নেই।

আমাদের প্রজাতন্ত্রের আরেক দুর্বলতা স্থানীয় শাসনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হতে না দেওয়া। বাহাত্তরের সংবিধানই বলে দিয়েছিল, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে’। কার্যত ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্যদের অধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন : বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রাজাকার পুত্র!

৪৯ বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অর্জন অসামান্য। দারিদ্র্য কমেছে। গড় আয়ু বেড়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে করা সম্ভব হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। ব্যাপক দুর্নীতি না হলে বাংলাদেশ এশিয়ার অনেক দেশকে ছাড়িয়ে যেত। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভূমিকা রাখছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু আমরা পিছিয়ে পড়ছি জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায়। গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স ২০২০ প্রকাশিত সূচক অনুযায়ী, ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। সুবর্ণজয়ন্তীকে শুধু আত্মপ্রচারমূলক স্মৃতিচারণায় পর্যবসিত না করে আমাদের প্রতীক্ষা হোক শতবর্ষে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক ও উন্নত রাষ্ট্র।

● সৈয়দ আবুল মকসুদ লেখক ও গবেষক
আডি/ ১৬ ডিসেম্বর


Back to top button
🌐 Read in Your Language