
দিনাজপুর, ১৫ ডিসেম্বর- স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর, অথচ এখনও নির্ধারিত হয়নি দিনাজপুর জেলা শত্রুমুক্ত হয়েছিল কবে! তাই বরাবরের মতো এবারও সম্মিলিতভাবে মুক্তদিবস পালিত হচ্ছে না। অথচ দেশের কোন জেলা বা কোন অঞ্চল কবে মুক্ত হয়েছিল এর রয়েছে সঠিক দিনক্ষণের ইতিহাস। সেসব এলাকাগুলোও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে। তবে দিনাজপুর জেলার এমন পরিস্থিতিতে হতাশ সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ইতিহাসবিদরা। তার বলছেন, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এবং ইতিহাসকে সমুন্নত রাখতে পর্যালোচনা ও গবেষণার মাধ্যমে সঠিক দিন-ক্ষণ নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আগে ১৪ ডিসেম্বরই দিনাজপুর মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। পরে দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ১৫ ডিসেম্বরকে দিনাজপুর মুক্ত দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গত ২০১১ সাল থেকে এ দিবসটি পালন করা শুরু করে। তবে ২০১৪ সালে দিনাজপুর মুক্ত দিবসের সঠিক দিন-তারিখ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়। মুক্তিযোদ্ধারে মধ্যে কারও মতে দিনাজপুর মুক্ত হয়েছিল ১৪ ডিসেম্বর, কারও মতে ১৫ ডিসেম্বর আবার কারও মতে ১৬ ডিসেম্বর। যার ফলে ২০১৪ সাল থেকে দিনাজপুর মুক্ত দিবস পালন কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরে সম্মিলিতভাবে মুক্ত দিবস পালন না হলেও অনেকেই মত দেন যে দিনাজপুর পুরোপুরিভাবে হানাদার মুক্ত হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর। কারণ ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। এই পতাকা উত্তোলন করেছিলেন তৎকালীন ৭নং সেক্টরের চেয়ারম্যান এবং সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট এম আব্দুর রহিম।
দিনাজপুরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনুসারে, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের হামলার মুখে পাকসেনারা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ৮ ডিসেম্বর চিরিরবন্দরে মুক্তিযোদ্ধারা ৫১ জন রাজাকারকে বন্দি করে। ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা বিরলে পাক সেনাদের ঘাঁটির ওপর হামলা চালায় এবং ১১ ডিসেম্বর বিরলে পাকসেনারা হামলা চালিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করে চলে যায়। ১৩ ডিসেম্বর পাকসেনারা বিরলের ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে সৈয়দপুরের দিকে রওনা হয়। ১৪ ডিসেম্বর বিরল উপজেলার মঙ্গলপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিত্রবাহিনী যোগ দেয়। এদিকে ওইদিনই পাকসেনারা কাঞ্চন নদীর রেলওয়ের লোহার ব্রিজ, ভুষিরবন্দর ব্রিজ, মোহনপুর ব্রিজ, দিনাজপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভেঙে দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রচণ্ড ক্ষতি করে। এরপরে কত তারিখে দিনাজপুর থেকে পাকসেনারা চলে গিয়েছিল তা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
কারও মতে, ১৫ ডিসেম্বরে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে কোনঠাসা হয়ে পাকসেনারা সৈয়দপুরে চলে যায়। আবার কারও মতে, ১৪ ডিসেম্বরেই পাকসেনারা চলে যায়।
সেই সময়ের দিনাজপুর জেলা জয়বাংলা বাহিনীর প্রধান এবং মুজিব ব্রিগেড ও বিএলএফ’র সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম তালুকদার বলেন, আমরা গেরিলাযোদ্ধারা জেলা শহরে প্রবেশ করেছিলাম ১৫ ডিসেম্বরে। সাথে ছিলেন মিত্রবাহিনীর সদস্যরা। জেলা শহরে প্রবেশের আগে আমরা অবস্থান নিয়েছিলাম ঐতিহ্যবাহী কান্তনগর মন্দির এলাকায়। সেখানে রাতে আমাদেরকে লক্ষ্য করে মর্টার সেল নিক্ষেপ করেছিল পাকসেনারা। ওইসময়ে মিত্রবাহিনীর সদস্যরা আমাদেরকে আগাম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে যুদ্ধ হবে না এমন একটি সমঝোতার প্রক্রিয়া চলছে। তাই আমাদেরকে সম্মুখ বা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হয়েছিল। আমরা যখন দিনাজপুরে প্রবেশ করি এরপরে জেলা শহরে কোন পাক হানাদারদেরকে দেখিনি। আমার মতে, মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা যেতে পারে ১৫ ডিসেম্বরকে। একেকজন মুক্তিযোদ্ধা একেকদিক দিয়ে জেলায় প্রবেশ করেছে, যার কারণে যে যেভাবে দেখেছে সেটি সঠিক। তবে এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে সকলকে সম্মিলিতভাবে আলোচনার মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস উন্মোচনে একটি সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন।
এদিকে এবছর দিনাজপুর মুক্ত দিবস উদযাপন পরিষদ নামে একটি কমিটি ১৪ ডিসেম্বর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা করেছে। এই আয়োজনে থাকা মুক্তিযোদ্ধা ফরহাদ হোসেন বলেন, আমার দেখা ও জানামতে দিনাজপুর মুক্ত হয়েছিল ১৪ ডিসেম্বরে। আমি যেভাবে দেখেছি এবং যেসব তথ্য-উপাত্ত আছে সেটি নিয়ে একটি ডকুমেন্টরি করেছি।
তবে এটিই যে সঠিক এমনটি নিশ্চিত দাবি করতে পারেননি তিনি।
দিনাজপুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ
মুক্তিযুদ্ধের আরেক সংগঠক মকবুল হোসেন বলেন, আমরা ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা। আর এখন সকলেই নেতা সাজতে চায়। তাই সম্মিলিতভাবে একটি সিদ্ধান্ত হোক এটি কেউই চায় না। তবে আমার মতে, দিনাজপুর হানাদারমুক্ত হয়েছিল ১৫ ডিসেম্বরে, ১৪ ডিসেম্বরেও জেলায় পাকহানাদার বাহিনীর সদস্যরা ছিল এবং তারা একে একে জেলা ত্যাগ করছিল। সেই হিসেবে ১৪ ডিসেম্বর নয়, ১৫ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়েছিল দিনাজপুর। সম্মিলিতভাবে সঠিক ইতিহাস উন্মোচন হোক এটা আমরা সবাই চাই। তবে এটি সম্ভব বলে মনে হয় না, এখন তো সবাই মুক্তিযোদ্ধা, সবাই নেতা। আমাদের মতো সংগঠকদের মূল্য কতটুকু। অথচ ১৯৭১ সালে আমরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দিনাজপুরে ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেছি, দেশকে মুক্ত করতে কতই না কাজ করেছি।
আরও পড়ুন : দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে হাফিজ উদ্দিন ও শওকত মাহমুদকে ‘শোকজ’
দিনাজপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করছেন দিনাজপুর সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাসুদুল হক। তিনি বলেন, আমি অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলেছি যারা দেশকে মুক্ত করার জন্য জীবন বাজি রেখে বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেছেন। তাদের অনেকের মতে ১৪ ডিসেম্বর আবার অনেকের মতে ১৫ ডিসেম্বর দিনাজপুর মুক্ত হয়েছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস উন্মোচন করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোন দিনে এই জেলা শত্রুমুক্ত হয়েছিল সেটি উন্মোচন করা সময়ের দাবি। এখনই যদি এই উদ্যোগ গ্রহণ করা না হয় তাহলে দেরি হয়ে যাবে। আমি অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং সেগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। অনেক লেখা প্রকাশনাও হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দিনাজপুর জেলা মুক্ত দিবসটি পালিত হোক এটা আমরা সবাই চাই।’
সূত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন
আডি/ ১৫ ডিসেম্বর









