ইউরোপ

ইউরোপে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ

লন্ডন, ২০ নভেম্বর – শীত শুরু হতেই ইউরোপে করোনা সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। করোনাভাইরাসে নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে গত এক সপ্তাহেই অঞ্চলটিতে পাঁচ শতাংশ বেড়েছে করোনার বিস্তার। ২০ লাখের বেশি মানুষের শরীরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে সংক্রমণ। অথচ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে এখনো একমত হতে পারেনি ইউরোপ। এখনো চলছে ভ্যাকসিনবিরোধী সমাবেশ। দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা।

জার্মানি, গ্রিস, ক্রোয়েশিয়া, অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশে করোনার সংক্রমণ বেড়ে এযাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে পৌঁছেছে।

সংক্রমণ হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পূর্ণ লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রিয়া। টিকা নেওয়াকেও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করেছে মধ্য ইউরোপের এই দেশ। অস্ট্রিয়ার বর্তমান এই কোভিড সংকটের জন্য টিকা-বিরোধীদের দায়ী করেন দেশটির চ্যান্সেলর। গত সোমবার থেকে যারা এখনো ভ্যাকসিন নেননি তাদের লকডাউনের আওতায় নেয়া হয়েছে।

এদিকে, গ্রিস ও স্লোভাকিয়ায় গত সোমবার থেকে টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের উপর লকডাউন জারি করা হয়েছে। জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্রও একই পথে হাঁটার কথা ভাবছে।

বেলজিয়াম ও আয়ারল্যান্ড দেশের জনগণকে বাসায় থেকে অফিস করার নির্দেশনা দিয়েছে ।

গ্রিসে ভ্যাকসিন গ্রহণ না করলে জনগণ পাবে না কর্মক্ষেত্র, বিনোদন কেন্দ্র এবং যানবাহনে প্রবেশের সুযোগ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস বলেন, আগামী সোমবার থেকে কার্যকর হচ্ছে করোনার বিধিনিষেধ। প্রাপ্তবয়স্ক কিন্তু টিকা নেননি এমন মানুষরা ঢুকতে পারবেন না হোটেল-রেস্তোঁরা-সিনেমা হল-যাদুঘর ও জিমে। করোনা নেগেটিভ সনদ দেখালেও লাভ হবে না।

করোনা সংকট শুরুর পর থেকে গ্রিসের স্বাস্থ্যকর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। কাজের চাপ এত বেশি যে নিরুপায় হয়ে বিক্ষোভেও নামতে শুরু করেছেন তারা।

পশ্চিম ইউরোপের ৬০ ভাগ মানুষ গ্রহণ করেছেন পূর্ণাঙ্গ ভ্যাকসিন ডোজ। একই সময়ে পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দাদের টিকাকেন্দ্রে নিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে করোনায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে রাশিয়ায়। সেখানে করোনায় সংক্রমিত হয়ে মৃতের সংখ্যা এখন দুই লাখ ৬০ হাজার ৩৩৫। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ায় প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন ১২ শতাধিক।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্তের তালিকায় পাঁচটি দেশের একটি রাশিয়া। টিকা প্রয়োগের পর কয়েক মাস আক্রান্ত ও মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গত সপ্তাহ থেকেই তা ফের বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্র, রেস্তোরাঁ কিংবা শপিংমলে গেলে টিকা সনদ সঙ্গে রাখার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রাশিয়ার মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষ করোনার দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন।

জার্মানিতে করোনায় মৃতের সংখ্যা এক লাখ হতে চলেছে (৯৮, ৯০৮)। সংক্রমণও বাড়ছে। সপ্তাহে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সংখ্যা ৩৩৬ ছাড়িয়েছে। কিছু হাসপাতালের আইসিইউ ভরে যাওয়ায় নতুন করে রোগী ভর্তি করা যাচ্ছে না। অথচ করোনা সংকটের শুরুর দিকে জার্মানির মূল স্রোতের রাজনৈতিক দলগুলো কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য সত্ত্বেও যেভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেই ‘ঐকমত্যে’ এখন ফাটল দেখা যাচ্ছে।

জার্মানিতে আগের সব রেকর্ড ভেঙে একদিনে ৬৯ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। একই দিনে করোনায় নতুন করে ২৬৬ জনের মৃত্যুচিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে জনমনে। এত দিন শিথিল থাকা করোনার বিধিনিষেধে আবারও কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কেল প্রশাসন। করোনা নিয়ন্ত্রণে নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সরকার। এখন থেকে সাধারণ নাগরিকরা কর্মক্ষেত্রে ও গণপরিবহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে থ্রিজি নিয়ম অনুসরণ করবেন। অর্থাৎ টিকা নেওয়া, করোনা থেকে সেরে ওঠা এবং ৪৮ ঘণ্টার কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট দেখাতে হবে কর্মজীবী ও গণপরিবহন ব্যাবহারকারীদের।

ইউরোপের আরেক দেশ ইতালিতে করোনায় মৃতের সংখ্যা এক লাখ ৩২ হাজার ৯৬৫ জন। সংক্রমণ আবার বাড়ছে। অথচ ভ্যাকসিনবিরোধী সমাবেশ এখনো চলছে। মিলানের এক সমাবেশের একটা প্ল্যাকার্ডে বিল গেটসকে বলা হচ্ছে ‘যিশুবিরোধী’।

স্পেনে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকদেরও দেওয়া হচ্ছে করোনার টিকা। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় স্পেনে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৭ হাজার মানুষ, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

স্পেনে চালু করা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ টিকাকেন্দ্র। প্রশাসন বলছে, পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার পর করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত এক সপ্তাহে সংক্রমণের হার ৫২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য বিভাগ।

আয়ারল্যান্ডে আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যু হারও বাড়ছে সমানতালে, আইসিইউতেও করোনা রোগীর সংখ্যা গেল এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। গৎ দুই সপ্তাহে প্রায় ৯০০ স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কয়েক মাস আগেও দেশটির করোনা পরিস্থিতি ছিল নিয়ন্ত্রণে। খুলে দেওয়া হয়েছিল রেস্টুরেন্ট, পানশালাগুলো।

সূত্র : দেশ রূপান্তর
এন এইচ, ২০ নভেম্বর


Back to top button
🌐 Read in Your Language