পশ্চিমবঙ্গ

ফেসবুকে অভিমান জাহির করে রাজনীতি থেকে বিদায় নিলেন বাবুল সুপ্রিয়

কলকাতা, ৩১ জুলাই – অভিমানে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়! বাড়ি থেকে বের হয়ে শনিবার গাড়িতে বসে নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে রাজনীতিকে বিদায় জানান এই সাংসদ।

বিজেপি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে বাবুল এ ঘোষণা দিয়েছেন বলে মনে করছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা।

বিধানসভা ভোটে পরাজয় এবং পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়ে বাবুল এমনিতেই ক্ষুন্ন ছিলেন। তখন থেকেই তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। বস্তুত, নিভৃতে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি দিল্লি ছেড়ে মুম্বাই চলে যান।

আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ফেসবুক পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বাবুলের বাবা এবং স্ত্রী তাকে বারবার ফোন করেছেন। কিন্তু বাবুল তার সিদ্ধান্তে অনড় বলেই তারা জানাচ্ছেন।

এর পর বাবুল কী করবেন? তা তিনি নিজে ছাড়া কেউই জানেন না। তবে তিনি সর্বপ্রথমে সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দেবেন। তা-ও তিনি ঠিক করে ফেলেছেন। বাবুলের এক ঘনিষ্ঠজন জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী বললেও বাবুল ওর সিদ্ধান্ত থেকে নড়বে না বলেই মনে হচ্ছে। কারণ, এর আগেও বিজেপি-র প্রথমসারির নেতারা ওকে রাজনীতি ছাড়তে বারণ করেছেন। কিন্তু ও ওর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল।’

তার ওই ঘনিষ্ঠ আরও বলেছেন, বাবুলের ফেসবুক পোস্টের কোনো প্রভাব ওর বাবা এবং স্ত্রী-র উপর যেন না পড়ে, তাই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসে বিষয়টা লিখেছে।’

গত বেশ কিছুদিন ধরেই বাবুল রাজনীতি ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। কথা বলছিলেন পরিবার, পরিজন এবং বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। বাবুলের ঘনিষ্ঠদের মতে, রাজ্যনেতৃত্বের একাংশের উপর অভিমান এবং ক্ষোভ থেকেই বাবুল ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার সঙ্গে দিলীপ-শিবিরের সম্পর্ক কোনোদিনই ভালো ছিল না।

আবেগপ্রবণ বাবুল মনে করেছেন, বারবার তাকে বিভিন্ন বিষয়ে দিলীপ-শিবিরের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। ‘অন্যায্য’ ভাবে তাকে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। বাবুলের এক বন্ধুর কথায়, ‘‘কেন ও এ ভাবে বিভিন্ন বিষয়ে কাউকে কৈফিয়ত দিতে যাবে! ও নিজেকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। টাকাপয়সার জন্য রাজনীতি করেনি। এখনও ও মাসে একটা গান গাইলে বা কেউ ওকে মাসে একটা শো দিলে ওর জীবন চলে যাবে। কিন্তু এ ভাবে নিজের দলের কারও কারও কাছ থেকে কেন অযথা আক্রান্ত হতে হবে!’

বাবুল তার ঘনিষ্ঠমহলে বলেন, রাজনীতি থেকে কয়েকদিন ছুটি নিয়েছেন। মুম্বাই থেকে বাবুল দিল্লি ফিরে গিয়েছিলেন। সংসদের বাদল অধিবেশনেও তাকে দেখা গিয়েছিল। এর পর তিনি আবার ফেসবুকে পোস্ট করা শুরু করেন। গত কয়েকদিনে তার সে সব পোস্ট নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছিল। শেষপর্যন্ত ফেসবুকে দীর্ঘ স্টেটাস লিখেই রাজনীতির ছাড়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন বাবুল।

বাবুলের দাবি, মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার কারণে তিনি রাজনীতি ছাড়ছেন না। ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রশ্ন উঠবেই কেনই বা রাজনীতি ছাড়তে গেলাম? মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার সঙ্গে তার কি কোনও সম্পর্ক আছে? হ্যাঁ আছে। কিছুটা তো নিশ্চয় আছে! তঞ্চকতা করতে চাই না। তাই সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেই তা সঠিক হবে। আমাকেও তা শান্তি দেবে।’

বাবুল আরও লিখেছেন, ‘আজ বাংলায় বিজেপিই প্রধান বিরোধী দল। আজ পার্টিতে অনেক নতুন উজ্জ্বল তরুণ তুর্কি নেতা যেমন আছেন তেমনই অনেক প্রবীণ বিদগ্ধ নেতাও আছেন। এঁদের নেতৃত্বে দল এখান থেকে অনেক দূর যাবে এটা বলাই বাহুল্য| বলতে দ্বিধা নেই যে, আজ পার্টিতে কোনও একজন ব্যক্তিবিশেষের থাকা না থাকাটা যে কোনও বড় ব্যাপার নয় তাও স্পষ্ট হয়েছে এবং এটা মেনে নেওয়াটাই যে সঠীক সিদ্ধান্ত হবে এটাই আমার দৃঢ়, সুদৃঢ় বিশ্বাস।’

একই সঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘ভোটের আগে থেকেই কিছু কিছু ব্যাপারে রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে মতান্তর হচ্ছিল। তা হতেই পারে। কিন্তু তার মধ্যে কিছু বিষয় জনসমক্ষে চলে আসছিল। তার জন্য কোথাও আমি দায়ী (একটি ফেসবুক পোস্ট করেছিলাম যা পার্টির শৃঙ্খলাভঙ্গের পর্যায়েই পড়ে) আবার কোথাও অন্য নেতারাও ভীষণভাবে দায়ী, যদিও কে কতটা দায়ী সে প্রসঙ্গে আমি আজ আর যেতে চাই না। কিন্তু সিনিয়র নেতাদের মতানৈক্য ও কলহে পার্টির ক্ষতি তো হচ্ছিলই, ‘গ্রাউন্ড জিরো’-তেও পার্টির কর্মীদের মনোবলকে যে তা কোনওভাবেই সাহায্য করছিল না তা বুঝতে ‘রকেট বিজ্ঞান’-এর জ্ঞানের দরকার হয় না। এই মুহূর্তে তো তা একেবারেই অনভিপ্রেত তাই আসানসোলের মানুষকে অসীম কৃতজ্ঞতা ও ভালবাসা জানিয়ে আমিই সরে যাচ্ছি।’

বাবুলের রাজনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল মাঝ আকাশে, বিমানে বাবা রামদেবের পাশের আসনে বসে। নাটকীয় সেই উত্থান তাকে গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে নিয়ে গিয়েছিল জাতীয় রাজনীতির আঙিনায়। লোকসভা ভোটে আসানসোল থেকে জয় এবং তার পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিত্ব। পর পর দু’টি লোকসভা ভোটে জেতেন বাবুল। কেন্দ্রে মন্ত্রীও হন দু’দফায়। কিন্তু বাংলায় বিধানসভা ভোটে প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই বাবুলের সঙ্গে রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের সঙ্ঘাত শুরু হয়েছিল।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাবুল সুপ্রিয়র হয়ে প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসানসোলের ভোটারদের কাছে বলেছিলেন, ‘‘হামে বাবুল চাহিয়ে।’’ এর পরে বাবুলের জয় এবং মন্ত্রিত্ব। ৭০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে তৃণমূলের শ্রমিকনেত্রী দোলা সেনকে হারান বাবুল। পাঁচ বছর পরে আরও ভাল ফল হয় আসানসোল কেন্দ্রে। ২০১৯ সালে বাবুল তৃণমূলের মুনমুন সেনকে হারান প্রায় দু’লাখ ভোটে।

দু’বার জয়ের পরেই তিনি মন্ত্রী হন। প্রতিমন্ত্রী হলেও গুরুত্বপূর্ণ দফতরও পেয়েছিলেন বিজেপি-তে মোদীর প্রিয় হিসেবে পরিচিত বাবুল। প্রথমবার হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী। এর পরে ২০১৬ সালে দফতর বদলে হয় ভারী শিল্প এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প। ২০১৯ সালে সাংসদ হওয়ার পরে বাবুল তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ দফতর (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন)-এর মন্ত্রী হন। কিন্তু গত ৭ জুলাই মন্ত্রিসভার রদবদলে বাদ যান বাবুল। এর পর থেকেই বাবুলের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়।

সূত্র : ঢাকাটাইমস
এম এউ, ৩১ জুলাই

Back to top button