ইসলাম

ইখলাস থাকলে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য অল্প আমলই যথেষ্ঠ

হাদিসে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ইমানকে খাঁটি করো, অল্প আমলই নাজাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে।’ বায়হাকি, শোয়াবুল ইমান : ৬৪৪৩

বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, ‘আমলে ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা থাকলে আল্লাহকে খুশি করার জন্য অনেক আমলের দরকার নেই। ইখলাস থাকলে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য অল্প আমলই যথেষ্ঠ।’ সব ইবাদতের একমাত্র লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাই ইখলাসবিহীন কোনো ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না। আল্লাহতায়ালা নবীদেরও ইখলাসের আদেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের (নবীদের) এ ছাড়া আর কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর ইবাদত করবে।’ সুরা বাইয়্যিনাহ : ৫

ইখলাস কী : একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ইবাদতসহ যাবতীয় কাজ সম্পাদনের নামই ইখলাস। কে আমাকে দেখছে, আর কে দেখছে না সেটা না ভেবে ‘আল্লাহ সর্বক্ষণ আমাকে দেখছেন’ এই ভয় ও ভাবনা মাথায় রেখে ইবাদত করার নাম ইখলাস। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা মানত পূর্ণ করে এবং সেদিনকে ভয় করে, যেদিনের অনিষ্ট হবে সুদূরপ্রসারী। তারা আল্লাহকে ভালোবেসে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের আহার দেয়। (তারা বলে) শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা তোমাদের আহার দান করি। তোমাদের কাছে আমরা কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ সুরা আদ দাহর : ৭-৯

আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমের একাধিক জায়গায় মানুষকে ইখলাস অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিসেও এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। কোরআন-হাদিসের এসব বাণী অধ্যয়নের পর ইসলামি স্কলার ও গবেষক আলেমরা সাধারণ মানুষকে ইখলাসের গুরুত্ব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। যেমন ইমাম বোখারি (রহ.) ‘সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’ হাদিসটি দিয়ে বোখারি শরিফ আরম্ভ করেছেন।

আল্লামা জুরজানি (রহ.) বলেন, ‘মানবাত্মার পরিচ্ছন্নতায় বিঘœ ঘটায় এ ধরনের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা থেকে অন্তর খালি করাকে ইখলাস বলে। আর সেটার মূলকথা হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রে এ কথা চিন্তা করা, তার সঙ্গে কোনো না কোনো বস্তুর সংমিশ্রণ থাকতে পারে, তবে যখন কোনো বস্তু অন্য কিছুর সংমিশ্রণ থেকে মুক্ত হয়, তখন তাকে খাঁটি বস্তু বলা হয়। আর এ খাঁটি করার কাজটি সম্পাদন করার নাম হচ্ছে ইখলাস।’ মাদারেজুস সালেকিন : ২/৯২

হুজাইফা আল মুরআশি (রহ.) বলেন, ‘বান্দার ইবাদত প্রকাশ্য ও গোপনে উভয় অবস্থাতে একই পর্যায়ের হওয়ার নাম ইখলাস।’ আত তিবইয়ান ফি আদাবে হামালাতিল কোরআন : ১৩

ইখলাসে প্রয়োজনীয়তা : ইখলাসহীন ইবাদত আল্লাহর কাছে মূল্যহীন। ইসলামে এমন কিছু আমল রয়েছে, যেগুলোর জন্য ইখলাস বেশি প্রয়োজন। না হলে ওইসব ইবাদত পরকালে কোনো কাজে আসবে না। বিশেষ করে সৃষ্টির সেবা, সুন্দর আচরণ, মানবতা, সহানুভূতি ও দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব রক্ষার মতো আমলের ক্ষেত্রে। বর্তমান উম্মতে মুসলিমাহ নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সময় পার করছে, এই সংকট থেকে পরিত্রাণ, মুক্তি ও সংশোধনের জন্য ইখলাসওয়ালা আমল বেশি প্রয়োজন।

ইখলাসের ফলাফল : নেককার মুমিন বান্দার অন্তরে যখন ইখলাস পাওয়া যাবে, তখন সে ইখলাসের অনেকগুলো উপকারিতা ও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল লাভ করবে। আর সেগুলো হলো

আমল কবুল হওয়া : হজরত আবু উমামা আল বাহেলি (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা শুধু ওই আমল কবুল করবেন, যে আমল কেবল আল্লাহর জন্য করা হবে এবং আমল দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা উদ্দেশ্য হবে।’ নাসায়ি : ৩১৪০

সওয়াব লাভ : হজরত সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখনই তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কোনো খরচ করবে, তার ওপর তোমাকে সওয়াব দেওয়া হবে।’ সহিহ্ বোখারি : ৫৬

ছোট আমল বড় আমলে পরিণত হয় : আল্লামা ইবনুল মোবারক (রহ.) বলেন, ‘অনেক ছোট আমল আছে নিয়ত তাকে বড় করে দেয়, আবার অনেক বড় আমল আছে, নিয়ত তাকে ছোট করে দেয়।’ জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম : ১৩/১

গোনাহ ক্ষমা : ইখলাস গোনাহ মাপের বড় কারণ। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘এক প্রকার আমল এমন আছে, যখন কোনো মানুষ আমলটি পরিপূর্ণ ইখলাস ও আল্লাহর আনুগত্যের সঙ্গে করে, আল্লাহতায়ালা এ আমলের দ্বারা তার কবিরা গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেন।’ যেমন হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে হাদিস বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে সমগ্র মাখলুকের সামনে উপস্থিত করা হবে, তারপর তার জন্য নিরানব্বইটি দপ্তর (হিসাবের খাতা) খোলা হবে, প্রতিটি দপ্তর চোখের দৃষ্টির সমান দূরত্ব। তারপর আল্লাহ বলবেন, তুমি কী এর কোনো কিছুকে অস্বীকার করো, তখন সে বলবে, না, হে আমার প্রভু! তখন আল্লাহ বলবেন, তোমার ওপর কোনো জুলুম করা হবে না। তারপর তার জন্য হাতের তালুর সমপরিমাণ একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে, তাতে লিপিবদ্ধ থাকবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই। তখন সে বলবে, এতগুলো বড় বড় দপ্তরের মোকাবিলায় এ কাগজের টুকরোটি কোথায় পড়ে থাকবে? তারপর এ কাগজের টুকরোটি একটি পাল্লায় রাখা হবে এবং দপ্তরসমূহ অপর পাল্লায় রাখা হবে। তখন কাগজের টুকরোর পাল্লাটি ভারী হয়ে যাবে এবং দপ্তরসমূহ হালকা হয়ে পড়বে।’ তিরমিজি : ২৬৩৯

ইখলাসের আলামত : ইখলাসের কিছু নিদর্শন আছে বলে আলেমরা উল্লেখ করেছেন। ইখলাসওয়ালা বান্দাকে মুখলিস বলা হয়। তারা প্রসিদ্ধি লাভ, প্রশংসা কুড়ানো ও গুণাগুণ করাকে পছন্দ করেন না, তারা দ্বীনের জন্য আমল করতে পছন্দ করেন, নেক আমলের প্রতিযোগিতা করেন, আমলের বিনিময় একমাত্র আল্লাহর কাছে চান। তারা ধৈর্যধারণ করেন, কোনো প্রকার অভিযোগ পছন্দ করেন না। এই শ্রেণির লোক তাদের আমলকে গোপন রাখতে পছন্দ করেন, গোপনে আমল করেন এবং তাদের অধিকাংশ আমল হয় লোক চক্ষুর আড়ালে। তাদের গোপন আমলের সংখ্যা অধিক হয় থাকে প্রকাশ্য আমল থেকে। এসবই হলো একজন মানুষের মধ্যে ইখলাস থাকার নিদর্শন।

এস সি/ ২৮ জুলাই

Back to top button