অভিমত/মতামত

নাসিমা আখতার নিশা : নারী উদ্যেক্তাদের দেখিয়েছেন পথের দিশা

নজরুল ইসলাম বাসন

লন্ডনের বাঙ্গালী নারী হোম মেশিনিস্টরা ৬০ দশক থেকে ৯০ দশক পর্যন্ত বৃটেনের ফ্যাশন জগতে শ্রম দিয়েছেন। সে সময়ে লন্ডনে বাঙ্গালী নারীরা স্বামীর সাথে গার্মেন্টস শিল্পে শ্রম দিতেন। তারা ঘরে সেলাই মেশিন দিয়ে ড্রেস সেলাই করতেন। তাদের অর্জিত অর্থেই বৃটেনের বাঙ্গালীদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড সবল হয়েছিল, বৃহত্তর সিলেটের গ্রামীণ জনপদের প্রভুত উন্নতি হয়েছিল সেসব নারীদের অর্জিত অর্থে।

এই বিষয়টি গবেষণার দাবী রাখে। এর পরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের কথায় আসা যায় সম্ভবত ৮০ এর দশক থেকে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা গার্মেন্টস শিল্পের উত্থানে বিরাট ভুমিকা রাখেন। ২০২০ সালে বৈশ্বিক অতিমারির সময়ে নীরবে ই কমার্স বিপ্লব সাধিত হয়েছে উই এর মাধ্যমে, এই বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছেন নাসিমা আখতার নিশা।

গত বছর দুয়েক ধরে বাংলাদেশের নারী উদ্যেক্তারা ই কমার্সে বা অনলাইনে ব্যবসায় বেশ এগিয়ে চলেছেন। শহরের শিক্ষিত মেয়েরা ছাড়াও গ্রামের (শিক্ষিত) মেয়েরাও অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রিতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তাদের ই কমার্সে এগিয়ে আসার গল্প খুবই চমকপ্রদ। সামাজিক প্রচার মাধ্যম ফেসবুকে, ইউটিউবে, ইনস্ট্রাগ্রামে, টুইটারে এসব চমকপ্রদ সাফল্যের গল্প আমরা বিদেশ থেকেও দেখে থাকি।

এসব সাফল্যের গল্পকে স্বপ্ন থেকে বাস্তবে যিনি নিয়ে এসেছেন তিনি হলেন ফেসবুক গ্রুপ তিনিই উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম উই(ডঊ) এর স্বপ্নদ্রষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আখতার নিশা। উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম এক বিশাল ই কমার্স প্লাটফরম গড়ে তুলে এক নীরব বিপ্লব সংগঠিত করেছেন। তার এই প্লাটফরম বহু তরুন উদ্যেক্তার স্বপ্ন পূরনে বিরাট ভুমিকা পালন করে চলেছে। ২০২০ সালে নীরব বিপ্লব সাধিত হয়েছে উই(ডঊ) এর স্বপ্নদ্রষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আখতার নিশার নেতৃত্বে, যখন অবাঞ্চিত ও অনাকািিখত ভাবে সারা দেশে লকডাউন আরোপিত হল তখন লক্ষ লক্ষ পুরুষের সাথে কয়েক লক্ষ নারী কর্মহীন হয়ে পড়ে ছিলেন। এদের মধ্যে অনেকে কর্মহীন পুরুষ ও নারী বেকার হয়েছিলেন তারা অনেকেই আর উঠে দাড়াতে পারেননি।

তবে যারা বিকল্প পথের সন্ধান করেছিলেন তারা ঘুরে দাড়িয়েছেন উইমেন এন্ড ই-কমার্স ফোরাম বা উই(ডঊ) এর হাত ধরে। ৩০ হাজার সদস্য সংখ্যা ছিল যে উই(ডঊ) এর জানা গেছে সেই উই(ডঊ) এর সদস্য সংখ্যা ১১ লাখের মত দাড়িয়েছে। ফেসবুক গ্রুপ উই(ডঊ) এর স্বপ্নদ্রষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আখতার নিশা এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন উই(ডঊ) বাংলাদেশে ২০২০ সালে লকডাউন দেওয়ার পর ( পণ্য বিপননের সংগে যুক্ত খাতগুলোর মধ্যে) ই কমার্সের খাতকেই একমাত্র জরুরী খাত হিসাবে ঘোষনা করা হয়েছে। নারী উদ্যেক্তারা এই খাতকে এক বিরাট সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্চেছন। এখন শুধু নারীরা নয় পুরুষদের জন্যেও এই খাতে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ফেসবুক গ্রুপ উই এর সভাপতি নাসিমা আখতার নিশা আরো বলেছেন, এই খাত ভবিষ্যতে আরো নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খোলে দেবে। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা থেকে আমি গ্রামীন নারীদের সংযুক্ত করে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যে কাজ করছি।

দেশীয় পণ্য আমি বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। আমার স্বপ্ন বিশ্বের বড় বড় শহরে উই(ডঊ) এর শাখা থাকবে এ লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছি। ইনশাআল্লাহ আমি এ স্বপ্ন পূরণ করতে পারবো।ঃ ই কমার্সের বেশ কয়েকটি সমস্যা তুলে ধরেছেন ফেসবুক গ্রুপ উই(ডঊ) এর স্বপ্নদ্রষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আখতার নিশা, সেগুলো হলো : পণ্য ডেলিভারি, দেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে। দেশের ভেতরে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডেলিভারি ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে। ডেলিভারি ব্যবস্থা সুনিশ্চিত নাহলে তৃণমুলে যেসব উদ্যেক্তা পণ্য পাঠাচ্চেছন তারা এগিয়ে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন। দেশের বাইরে পণ্য পাঠাতে হলে পণ্যের মুল্যের চাইতে ডেলিভারি চার্জ বেশী দিতে হয়। এই সমস্যাগুলোর সাথে সাথে রয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ ও ওয়াইফাই এর সহজলভ্যতা। উদ্যেক্তাদের ব্যবসার প্রধান মাধ্যম হলো ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সংযোগ। কাজেই ওর্ডার নেয়া ও ডেলিভারি দেয়া অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। তাছাড়াও উদ্যেক্তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের ব্যাপারেও ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য।

প্রসংগত উল্লেখ করা যেতে পারে বাংলাদেশে ই কমার্স খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে ই কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ই-ক্যাব এর মাধ্যমে বেশ কিছু উদ্যেগ ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছিল, সেগুলো হলো মানব সেবা, আম মেলা, কোরবানির ডিজিটাল হাট। বাংলাদেশে এসব নতুন ইনোভেশন তরুন প্রজন্মকে আকৃষ্ঠ করবে । এ ছাড়াও ই ক্যাব ইকো সিস্টেম নিয়ে ও কাজ করছে। যারা ই কমার্সের সাথে যুক্ত হয়ে অনলাইনে নিজেদের ব্যবসা শুরু করেছেন তাদের মধ্যে যাদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং নেই তাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় ট্রেনিং নিলে ভাল হবে। তাছাড়াও জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে অফলাইন ও অনলাইনে ট্রেনিং সেমিনার ও ওয়ার্কশপের আয়োজন করা প্রয়োজন, এসব করতে হলে উই ও ই ক্যাবকেই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে হবে ।

বৃহত্তর সিলেটের উদ্যেক্তাদের বিদেশে বিপনন করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে এর জন্যে বিপননে উপযুক্ত প্রশিক্ষন আশু প্রয়োজন। বলা বাহুল্য বৃহত্তর সিলেটে রয়েছে পর্যটন ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে বিরাট সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে তরুন প্রজন্মকে কাজে লাগাতে হবে। এই পেনডেমিকের সময় আমার সুযোগ হয়েছে কিছু উদ্যেক্তাদের সাথে পরিচিত হওয়ার এর মধ্যে ঢাকায় আছেন বঙ্গজের সত্বাধিকারি বনানী চৌধুরী সীমা, রাকিবা আহমদ বুনন, ইশিতা শখের কহন, সিলেটে ঐতিহ্যের তাতের মাহবুবা হাসনাত উর্মি, ঝিয়ারীর রোজিনা, সুরমা কুটিরের জিবা বেগম, নাগরি হাটের সৈয়দা তাসমিয়া তাহলিল , থ্রি স্টিারের ফেরদৌসি, ক্রিয়েটর ল্যাব এর রোকসানা,গার্লি ফ্যাশনের মিথিলা, ছিন্নমুল শিশুদের নিয়ে কাজ করছেন রেশমা জান্নাত। এরা ই কমার্সে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তাদের পাশাপাশি আরো উদ্যেক্তাদের পর্যটন ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে সুযোগ দিলে তারা ভাল করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাস্ট্র, কানাডা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এনআরবি ও বাংলাদেশী এসবে খাতে যারা কাজ করছেন তাদের উ্সাহ উদ্দীপনা ও সহযোগিতা দিয়ে চলেছেন। বাংলাদেশে রয়েছেন তাদের অভিভাবক হিসেবে রয়েছেন শ্রদ্ধেয়া রাশেদা কে চৌধুরী, উপদেষ্ঠা সাবেক তত্বাবধায়ক সরকার। যুক্তরাস্ট্রে অভিভাবক হিসেবে রয়েছেন বিশ্ব সিলেট সম্মেলনের অন্যতম আয়োজক ও মহাসচিব ডা: জিয়া উদ্দিন আহমদ সাদেক, রাহাত হোসেন নাজু, সিলেটে রয়েছেন শুভাকাংখী হিসেবে রয়েছেন সমাজসেবী ফরিদা ইয়াসমীন।

কানাডার দেশে বিদেশে টিভির কর্ণধার নজরুল ইসলাম মিন্টু কাঞ্চন কন্যা নামে একটি অনুষ্ঠানের জন্য একটি সৗট বরাদ্দ করেছেন। জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বাচিক শিল্পী মুনমুন খান ও সমন্বয়কারী মাহবুবা হাসনাত উর্মি, যুক্তরাজ্যের জাস্ট হেল্প ফাউন্ডেশনের মিজানুর রহমান মিজান, ইউকেবিএটিম্ব কান্ট্রি ডিরেকটরএর সৈয়দ আসাদুজ্জামান সায়েম সিলেটের উদ্যেক্তাদের পাশে রয়েছেন।

সবশেষে যে কথা বলতে হয় তাহলো উই(ডঊ) এর নাসিমা আখতার নিশা নীরবে যে বিপ্লব সাধন করেছেন তার এই বিপ্লবী কাফেলায় আরো নিশা সৃষ্ঠি হলে বাংলাদেশের নারী উদ্যেক্তারা বিশ্বের বুকে নব দিগন্তের সুচনা করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। সকল উদ্যেক্তাদের জন্যে শুভ কামনা।

নজরুল ইসলাম বাসন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক, লন্ডন

Back to top button