পাবনা

পাবনা জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজন না থাকলেও অক্সিজেন গ্রহণ

পাবনা, ১২ জুলাই – পাবনা জেনারেল হাসপাতালে করোনা ইউনিটে অনেক রোগী প্রয়োজন ছাড়াই অক্সিজেন নিচ্ছেন। অনেক রোগী ও তার স্বজনরা অক্সিজেনকেই ওষুধ ভাবা শুরু করেছেন। এভাবে যথেচ্ছ অক্সিজেন নিলে রোগীর প্রাণহানির কারণও হতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাই অক্সিজেন গ্রহণে সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, তিনি করোনা ইউনিটে গিয়ে দেখেন অনেক রোগী বিনা প্রয়োজনে অক্সিজেন নিচ্ছেন। তিনি ক্ষমতাসীন দলের একজন করোনা রোগীর উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, তার স্বাভাবিক অক্সিজেন লেভেল ছিল ৯৮। যার অক্সিজেন নেয়ার কোনো প্রয়োজনই নেই। কিন্তু তিনি অক্সিজেন নিয়ে শুয়ে ছিলেন। এটাকে কেউ কেউ ওষুধ ভেবে বসে আছেন। কেউবা অক্সিজেন সিলিন্ডার পাওয়াটা একটা বাড়তি সুবিধা মনে করছেন। এতে করে তারা যেমন শারীরিক ঝুঁকির মুখে তেমনি অক্সিজেনের কৃত্রিম সঙ্কটও দেখা দিয়েছে।

এদিকে, কৃত্রিম সঙ্কট দেখিয়ে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সরেজমিনে একজন রোগীর জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনতে গেলে রিফিল সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে একজন ডিলার দিতে চাইলেও তার শর্ত মোতাবেক সাড়ে ১৭ হাজার টাকা দিতে হয়।

এছাড়া এক শ্রেণির অ্যাম্বুলেন্স চালক সিলিন্ডার বাণিজ্য করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক জানান, তাদের মধ্যে কিছু চালক সিলিন্ডার রিফিল করে রাখে। এসব রোগীর কাছে বিক্রি করেন চড়া দামে। রোগীর জটিলতা বুঝে দাম হাঁকানে হয়।

তিনি আরও জানান, রিফিল করতে মাত্র ৩০০ টাকা লাগলেও রোগীর স্বজনদের ব্ল্যাকমেইল করে একটি সিলিন্ডার সরবরাহে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে পাবনায়। করোনা ও করোনার উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পাবনা জেনারেল হাসপাতাল। হাসপাতালে সিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন অনেক রোগী। হাসপাতালে ভর্তি হতে না পারায় বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া করেও চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেকেই।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. সালেহ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ১০০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু আছে। গত এক সপ্তাহে হাসপাতালের করোনা বিভাগে প্রায় ১৭০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০০ জন এখনো চিকিৎসাধীন। তবে, সিট দিতে না পারলে করোনা বিভাগে কোন রোগী ভর্তি করা হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনা চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন সরবরাহসহ অন্যান্য সুবিধা থাকা প্রয়োজন। তবে করোনা হলেই সব রোগীদের অক্সিজেন প্রয়োজন হবে তা নয়। আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই নিজেদের বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে নিয়ে অথবা ভাড়া করে নিজেদের ইচ্ছামতো অক্সিজেন নেয়ার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে জানান তিনি।

ডা. সালেহ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘অক্সিজেন কোনো ওষুধ নয় যে বাড়িতে থেকে ইচ্ছামত ব্যবহার করা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে অক্সিজেনের মাত্রা না জেনে অক্সিজেন ব্যবহার ঠিক নয়।’

এদিকে, সারা দেশের মতো পাবনাতেও বিনা মূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহের কাজ করছেন বেশ কিছু ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। জেলায় বিনা মূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করেন এমন একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রোগী ও তাদের স্বজনরা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে অক্সিজেনের চাহিদার ব্যাপারে জানালে তারা রোগীর বাড়িতে বা হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার পৌঁছে দেন।

পাবনার বেসরকারি ক্লিনিক শিমলা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন সরওয়ার জাহান ফয়েজ বলেন, ‘করোনাকালে পাবনায় স্বেচ্ছাসেবীরা মহতী কাজ করে চলেছেন। তবে অক্সিজেন ব্যবহারে রোগীদের সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। রোগীর শারীরিক অবস্থা, উচ্চ রক্তচাপ ও ফুসফুসের অবস্থা জানতে হবে। এরপর প্রয়োজন ও পরিমাপ অনুযায়ী অক্সিজেন দিতে হবে। ফলে বাড়িতে বসে ইচ্ছামতো অক্সিজেন গ্রহণ উচিত নয়। অক্সিজেন নেয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা ভালোর চেয়ে অনেক সময় খারাপ করছে। কিন্তু কাউকেই বিষয়টি বোঝানো যাচ্ছে না। শারীরিক অন্য কোনো সমস্যার কারণে রোগীর মৃত্যু হলেও অক্সিজেন সঙ্কটের কথা বলা হচ্ছে। তাই চিকিৎসকরাও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না।’

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক সালেহ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ অক্সিজেন ব্যবহারের একটি নির্দেশনা দিয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ১৮ থেকে ২০ জনের অক্সিজেন প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বাইরে থেকে অক্সিজেন কিনে গ্রহণ করছেন। অনেকে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ লাইন থেকে ইচ্ছেমত অক্সিজেন নিচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইচ্ছেমতো অক্সিজেন নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে অক্সিজেন নিতে হবে, এটা ঠিক। তবে সেটির একটি সঠিক পরিমাপ রয়েছে। তাই অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সতর্ক হতে হবে। একইসঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’

সূত্র: জাগো নিউজ
এম ইউ/১২ জুলাই ২০২১

Back to top button