মুক্তমঞ্চ

দাবদাহ, লোভ ও অস্বস্তির সময়

আসিফ নজরুল

ভানুয়াতু দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপদেশ। এটি প্রায় ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের, লোকসংখ্যা মাত্র ৩ লাখের মতো। ৮৪টি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই নিঃসঙ্গ দ্বীপরাষ্ট্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য পরিচিত। সাম্প্রতিক কালে এটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে গত আট বছরে তলিয়ে গেছে তোরেস, পেলে, এনগোনাসহ ভানুয়াতুর কয়েকটি দ্বীপ। এমন আশঙ্কা বহু আগে ব্যক্ত করেছিল দেশটি। ৩০ বছর আগে জলবায়ু চুক্তির আলোচনা চলাকালে কিছু শিল্পোন্নত দেশ এটি মানতেই রাজি হয়নি যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তারা চাইছিল সুস্পষ্ট প্রমাণ। এর জবাবে ভানুয়াতুর প্রতিনিধির বক্তব্য ছিল, ‘বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবের প্রমাণের কথা কেউ কেউ বলেছেন, কিন্তু এই প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করার বিলাসিতা আমাদের নেই। আমরা মনে করি, প্রমাণের জন্য অপেক্ষা আমাদের নিশ্চিহ্ন করবে।’

ভানুয়াতুর এই বক্তব্য পরিবেশ আইনের প্রিকশোনারি প্রিন্সিপাল-এর মর্মবাণী হিসেবে ধরা হয়। এই প্রিন্সিপাল বা নীতি অনুসারে কিছু কিছু পরিবেশগত ঝুঁকি এতই সর্বনাশা এবং অমোচনীয় যে সামান্য আভাস পেলেই এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন এমনই একটি ঝুঁকি। যেমন বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে আবহাওয়া অবোধ্য হলে, আকস্মিক অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বা খরার প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হলে, সর্বোপরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গেলে এটিকে ঠিক করার কোনো উপায় মানুষের হাতে নেই। তাই অবস্থা এমন ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

উষ্ণতা বৃদ্ধির মানবসৃষ্ট কারণ হচ্ছে তেল, গ্যাস, কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহার, বন উজাড়, খামার ও ভূমি ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ইত্যাদি। প্রিকশনারি নীতির আলোকে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সর্বশেষ ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিসহ একে একে চারটি চুক্তি বিশ্ব গ্রহণ করেছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

২.

প্যারিস চুক্তি ও তার বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এড়ানো যাচ্ছে না। এটি বর্তমানে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে তা কখনো কখনো আমাদের কল্পনাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কানাডা ও উত্তর-পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঞ্চলে সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রতিদিনই তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তার একটি উদাহরণ মাত্র। কানাডার একটি অঞ্চলে এটি বেড়ে প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়। ভয়াবহ তাপমাত্রায় গাড়ির কাচ ফেটে যায় বা গলে পড়ে, পাওয়ার কেবল গলে যায়, এসিসহ শীত নিরোধক সরঞ্জাম বিকল হয়ে পড়ে, রাস্তার কংক্রিট গলে বা ফেটে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ে, হাড় কাঁপানো শীতের দেশে গরমে মারা যায় কয়েক শ মানুষ।

এই অকল্পনীয়, অস্বাভাবিক, অভূতপূর্ব উষ্ণতার জন্য হিট ডোম নামের একটি পরিস্থিতি বা ফেনোমেনাকে দায়ী করা হচ্ছে। এর ফলে গরম বাতাসের কুণ্ডলী বায়ুমণ্ডলের উচ্চ চাপের কারণে ওপরে উঠতে না পেরে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি আরও ঘন ও তীব্র হতে থাকে। হিট ডোমের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতা এককভাবে দায়ী কি না, তা নিয়ে সামান্য বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যেটা নিয়ে একদমই বিতর্ক নেই, তা হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবের ভয়াবহতা। কানাডার ও আমেরিকার উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে অতি উন্নত প্রযুক্তি সত্ত্বেও বৈশ্বিক উষ্ণতার কাছে কত অসহায় হয়ে উঠতে পারে মানুষ।

বৈশ্বিক উষ্ণতার মাত্রা নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে বর্তমান ঘটনাগুলো। যেমন এটা আমরা সবাই জানি যে প্রি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল সময়ের চেয়ে বর্তমানে তাপমাত্রা ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধি স্থানীয়ভাবে বায়ুমণ্ডল ও সমুদ্রপৃষ্ঠে এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। যেমন কানাডায় এর আগে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৩৭ সালে, সেটি ছিল ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার গ্রাম লেটন-এ ২৯ জুন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি, অর্থাৎ আগের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি বেশি। এই তীব্র গরমের কারণে সৃষ্ট অগ্নিদহনে পোড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গ্রামটির অনেকাংশ।

অস্বাভাবিক ও ঘন ঘন তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘটনা ঘটছে অন্যান্য জায়গায়। ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ আটটি জুন মাসের পাঁচটি হয়েছে গত ১০ বছরে। সাইবেরিয়ার গত পাঁচ বছরে দুবার তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে, পৃথিবীর শীতলতম মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকায় গত বছর সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আফ্রিকার বহু দেশে খরা আর ধূলিঝড় বেড়েছে কয়েক গুণ বেশি।

৩.

বৈশ্বিক উষ্ণতা বহু মানুষকে বিচলিত করছে, কিন্তু এর সুবিধা নিতে বসে থাকা শক্তিশালী চক্রও রয়েছে বিশ্বে। যেমন: বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য আর্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রের বরফ ভয়াবহ মাত্রায় গলে যাওয়ায় সেখান দিয়ে পণ্য বহনকারী জাহাজের নতুন যাতায়াত পথ (রুট) উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে। উত্তর আটলান্টিকের সঙ্গে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যের এই রুটটি নর্দার্ন প্যাসেজ বা আর্কটিক সি রুট নামে পরিচিত। বর্তমানে চীন বা জাপান থেকে ইউরোপ যেতে সুয়েজ খাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট কোস্টে যেতে পানামা খাল ব্যবহার করতে হয়। সারা বছরের জন্য আর্কটিক সি রুট উন্মুক্ত হয়ে গেলে এসব রুট আর সেভাবে ব্যবহার করতে হবে না, ফলে কমে যাবে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব। এটি সহজেই অনুমেয় যে পৃথিবীর ৮০ শতাংশ কার্গো বহনকারী শিপিং ইন্ডাস্ট্রি সময় ও খরচ কমাতে এবং শিল্পোন্নত দেশগুলো বাণিজ্যসুবিধা নিতে কতটা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করবে আর্কটিক রুট।

আশঙ্কার দিক হচ্ছে পৃথিবীর জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এটি। জাহাজের অবাধ চলাচলে আর্কটিক অঞ্চলে উষ্ণতা আরও বাড়বে, উষ্ণতা বাড়লে বরফের বিস্তৃতি আরও কমবে, সমুদ্রপৃষ্ঠ বরফের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা ধরে রাখে বলে এ জন্য তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।

আর্কটিক অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য শুধু নয়, এর মাশুল দিতে হবে মানুষকেও। কারণ, বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে হিটওয়েভ, ওয়াইল্ড ফায়ার, ফরেস্ট ফায়ার, আটলান্টিক হারিকেন—এসব দুর্যোগের সম্পর্ক এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। কানাডা আর আমেরিকার সাম্প্রতিক হিটওয়েভ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

৪.

মনে হতে পারে এসব পশ্চিমা দেশের বিষয়, আমাদের মতো গরিব দেশের কী দায় আছে তাতে? আমাদের দায় ঐতিহাসিকভাবে না থাকলেও বর্তমানে আছে। সেটি কতটুকু, তা বোঝার জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, নিজের দেশের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি আমরা।

আমাদের দেশের সবচেয়ে অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ সুন্দরবনের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ সরকার এগিয়ে নিচ্ছে বিশ্বে ও দেশে নানান তথ্যাভিজ্ঞ মহলের জোর আপত্তি সত্ত্বেও। গত সপ্তাহে রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ভারত থেকে নিম্নমানের কয়লা আমদানির সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়।

বর্তমানে বিদ্যুৎ সম্পদে উদ্বৃত্ত এ দেশে সুন্দরবনের পাশেই ঝুঁকিপূর্ণ রামপাল প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে নিরাপদ প্রযুক্তির মতো নানান অগ্রহণযোগ্য যুক্তি দিচ্ছে সরকার। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো প্রযুক্তি শতভাগ নিরাপদ নয় এবং সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হলে তা কোনোভাবেই মোচন করা যাবে না। প্রিকশনারি নীতি শুধু নয়, সাধারণ বিচারবুদ্ধিতেই এমন একটি প্রকল্প নিয়ে এত দূর অগ্রসর হওয়া উচিত হয়নি সরকারের।

ভানুয়াতুর একটি দ্বীপ সমুদ্রে বিলীন হওয়ার পর সেখানকার অধিবাসীরা বলেছিলেন, ‘মনে হলো আমাদের একটা অঙ্গ খসে পড়ল শরীর থেকে।’ সুন্দরবনকে বলা হয় বাংলাদেশের শ্বাসযন্ত্র। সুনামি আর জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর প্রাকৃতিক ব্যূহ আর দেশের সবচেয়ে বড় কার্বন নিরোধক আধার হচ্ছে সুন্দরবন। এর পাশে রামপাল প্রকল্পে কারও কোনো স্বার্থ থাকতে পারে, কিন্তু এতে দেশের যে সর্বনাশ হতে পারে, তা ভাবার প্রয়োজন ছিল বেশি।

বৈশ্বিক উষ্ণতার অকাট্য সব কুফল দেখেও এটি না ভেবে থাকাটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

এন এইচ, ০৯ জুলাই

Back to top button