ফুটবল

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ মানেই বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা,বর্তমানে এই খুনসুটির নতুন প্ল্যাটফর্ম সোশ্যাল মিডিয়া

ঢাকা, ০৯ জুলাই – খেলার মান যেমনই হোক, পছন্দের খোলোয়াড় দলে থাকুক আর নাই থাকুক আর ম্যাচ যত কম গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন – আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের ফুটবল ম্যাচ হওয়া মানেই সেই খেলার আগে ও পরে বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা, কাদা ছোঁড়াছুড়ি আর তর্ক-বিতর্ক।

এক সময় এই কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি আর তর্ক-বিতর্ক ঘরে, বাইরে, চায়ের দোকানের আড্ডার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ছিল। বর্তমানে এই খুনসুটির নতুন প্ল্যাটফর্ম সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক।

আপনি যদি ফেসবুক ব্যবহারকারী হন এবং খেলা নিয়ে সামান্যতম আগ্রহী নাও হন – ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার খেলা থাকলে ফেসবুকে দুই দলের সমর্থকদের উত্তপ্ত আলোচনা আপনার চোখে পড়বে, তা মোটামুটি নিশ্চিত।

কাজেই ১৪ বছর পর একটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে যখন আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন দু’দলের সমর্থকরা যে সোশাল মিডিয়ায় বাকযুদ্ধ, ট্রল আর ব্যঙ্গাত্মক মিম তৈরির প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়বেন, তা বলাই বাহুল্য।

আর দুই দলের সমর্থকদের এই ভার্চুয়াল যুদ্ধ সমর্থকরা নিজেরা যতটা উপভোগ করেন, তার চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ করেন কোনো দলকেই সমর্থন না করা নিরপেক্ষ দর্শক।

কোপা আমেরিকাকে কেন্দ্র করে যেভাবে শুরু ভার্চুয়াল যুদ্ধ

সাধারণত আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় কোন টুর্নামেন্ট চলার সময় দুই দলের সমর্থকদের দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

এ বছরের কোপা আমেরিকা শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তাপের আঁচ পাওয়া যেতে থাকে।

গ্রুপ পর্বে চিলির সাথে আর্জেন্টিনা ড্র করার পর একটি মিম ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের ছবির নিচে শিরোনাম দেয়া হয় ‘জিতে কম, গল্প বেশি, কাকলি ফুটবল টিম।’

মাস খানেক আগে বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া ‘কাকলি ফার্নিচার’এর বিজ্ঞাপনের ভাষা অনুকরণ করে তৈরি করা হয় এই মিম। বলা বাহুল্য, ২৮ বছর ধরে কোনো মেজর টুর্নামেন্ট না জেতা আর্জেন্টিনার ট্রফি খরাকে উপহাস করেই এই মিমের বিষয়বস্তু।

এই মিমের প্রত্যুত্তর তৈরি করতে কিন্তু একদিন সময়ও নেননি আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। ব্রাজিল অধিনায়ক নেইমারের অতিরিক্ত ডাইভ দেয়ার প্রবণতাকে খোঁচা দিয়ে ব্রাজিল দলের ছবির নিচে দেখা যায় ‘খেলে কম, অভিনয় বেশি, কাকলি ফুটবল টিম’ শিরোনাম।

সামাজিক মাধ্যমে দুই দলের সমর্থকদের ট্রল যুদ্ধ বা প্রতিপক্ষকে হেয় করার প্রবণতা এতই বেশি যে ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ’ করতেও অনেক ক্ষেত্রে পিছপা হচ্ছেন না অনেকেই।

সমর্থকদের এই দ্বন্দ্ব উপভোগ করলেও প্রতিপক্ষকে হেয় বা তাচ্ছিল্য করার এই প্রবণতাকে ভালো চোখে দেখেন না আর্জেন্টিনা সমর্থক বিধৌরা রওশন।

“আমি মেসি ভক্ত। কিন্তু তাই বলে নেইমারকে নিয়ে অপমানজনক ট্রল করা পছন্দ করি না। একজন খেলোয়াড়কে ভালো লাগলে, বা কোনো একটি বিশেষ দলকে সমর্থন করলে আরেকজন ব্যক্তি বা দলকে হেয় করতে হবে কেন?”

“আজকাল আমার অনেক আর্জেন্টিনা-সমর্থক বন্ধুদের মধ্যেও দেখি ব্রাজিল দলকে বা নেইমারকে তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেটি একেবারেই উচিত নয় বলে আমার মনে হয়”, বলেন মিজ. রওশন।

তাচ্ছিল্য করে ট্রল বা মিম তৈরি করার বিষয়টিকে অবশ্য কিছুটা ভিন্নভাবেও দেখেন অনেকে। যেমন ঢাকার বাসিন্দা তাসনিয়া লিরা মনে করেন, কারো অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার না করলে যে কোনো ধরণের ট্রল বা মিম গ্রহণযোগ্য।

“খেলার আগে-পরে দুই দলের সমর্থকদের এই খুনসুঁটি খেলাটাকে আরো বহুগুণ আকর্ষণীয় করে তোলে আমাদের মধ্যে। যেমন আমি ব্রাজিল সমর্থক, খেলার আগে আমার আর্জেন্টিনা সমর্থক বন্ধুদের সাথে ঝগড়া করে যখন খেলা দেখতে বসি তখন নিজের মধ্যেই অতিরিক্ত টেনশন কাজ করে। কারণ ব্রাজিল হেরে গেলে বন্ধুদের কাছে আমারও মাথা হেঁট হয়ে যাবে।”

“কাজেই এই ধরণের ট্রলগুলো আসলে খেলাটাকে আরো বেশি উপভোগ করতে শেখায়। খেলা নিয়ে ঝগড়ার সময় বন্ধুরা আমাকে ‘সেভেন আপ’ বলে খেপায়, আমি ওদের ‘আরজিতেনা’ বলে উত্যক্ত করি। এতে আমি কোনো সমস্যা দেখি না”, বলেন তাসনিয়া লিরা।

সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় যেসব ট্রল

দু‌’হাজার চোদ্দ বিশ্বকাপের পর থেকে দীর্ঘ সময় দুই দলের সমর্থকরা প্রতিপক্ষ সমর্থকদের খোঁচা দিতে একটি ঘটনার উপর নির্ভর করতো।

ঐ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিল নিজেদের মাঠে জার্মানির কাছে সাত গোল খাওয়ার পর ‘সেভেন আপ’ কথাটি শুনতে হয়নি, এমন ব্রাজিল সমর্থক হয়তো বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আবার ঐ আসরের ফাইনালে হেরে বিশ্বকাপে ২৮ বছরের খরা ঘোচাতে না পারায় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কত শতবার ‘আরজিতেনা’ শব্দটা শুনতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।

তবে সম্প্রতি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছে দুই দলকে নিয়ে করা দু’টি ট্রল, যে দু’টিকে বর্তমানে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে নিয়ে করা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মিম বলা যেতে পারে।

যার একটি হলো, ‘ব্রাজিল সমর্থন করা আর বাবার সম্পত্তি দেখে বিয়ে করা একই বিষয়।’

বিশ্বকাপে সাফল্য দেখে ব্রাজিলকে সমর্থন করা ব্রাজিল সমর্থকদের প্রতি কটাক্ষ করে উদ্ভূত এই মন্তব্য।

আর এর জবাবে ব্রাজিল সমর্থকদের উত্তর, ‘আর্জেন্টিনা সমর্থকরা শাবানার মত, শত অবহেলায়ও সংসার ছেড়ে যায় না।’

এই ধারণাগুলোর আসল উদ্ভাবক কে তা জানা না গেলেও ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার খেলা থাকলে বাংলাদেশের সোশাল মিডিয়ায় এরকম একের পর এক ভার্চুয়াল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে সমর্থকরা জর্জরিত হন, আর যুদ্ধটা উপভোগ করেন সবাই।

তথ্যসূত্র:বিবিসি বাংলা
এস সি/০৯ জুলাই

Back to top button