মিডিয়া

সরকারের সমালোচনা ও দুর্নীতির রিপোর্ট করায় বাংলাদেশে নিপীড়নের শিকার সাংবাদিকরা

লন্ডন, ০৩ জুলাই – বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান হারে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে এবং সরকারের কোভিড-১৯ নীতির সমালোচনার কারণে তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশে ২০২০ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বহুল বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) ২০১৮। করোনা মহামারিকালে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পর্যাপ্ত আকারে সুরক্ষিত ছিল না অথবা পূরণ করা হয়নি। বাংলাদেশে পুলিশ ও অন্য আইন প্রয়োগকারী এজেন্সিগুলো অব্যাহতভাবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। করোনা মহামারিকালে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। এবার বাংলাদেশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্তের খবর নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে দেশজুড়ে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদায় মন্দা এবং রপ্তানির মারাত্মক পতন হওয়ায় এখানে অর্থনীতিতে দুই দফা আঘাত লাগে। অর্থনৈতিক হতাশা থেকে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন গার্মেন্ট শিল্প এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কম বেতনভোগী লাখ লাখ শ্রমিক। ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা ছিল যত্রতত্র। এসব কেলেঙ্কারি নিয়ে যেসব সাংবাদিক বা সংবাদ মাধ্যম রিপোর্ট করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ বেশি থেকে বেশি নিপীড়ন চালিয়েছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার বিধান থাকার কারণে কোনো র‌্যালি বা বিক্ষোভ হতে পারেনি।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়। বলা হয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমিয়ে রাখতে, সাংবাদিক ও মানবাধিকারের পক্ষের ব্যক্তিদের ‘টার্গেট ও হয়রানি করতে সরকার অব্যাহতভাবে ব্যবহার করেছে বিতর্কিত এই আইনটি। এই আইন থেকে বিতর্কিত এবং শাস্তিমূলক বিধানগুলো বাদ দেওয়ার জন্য নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো বারবার আহ্বান জানানো সত্ত্বেও, তা সংশোধন করা হয়নি।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই আইনের অধীনে কমপক্ষে ৯০০ মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছে। আটক রাখা হয়েছে ৩৫৩ জনকে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন এজেন্সি ও সরকারের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিরা কমপক্ষে ২৪৭ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা, হয়রান এবং ভীতি প্রদর্শন করেছেন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আরও লিখেছে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। মার্চের পর করোনা মহামারির কারণে আউটডোরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ছিল সীমিত। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ইনডোর মিটিংকেও টার্গেট করেছে কর্তৃপক্ষ। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪৪ ধারা ব্যবহার করে সরকার ১৭টি জনসমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম নিয়েও রিপোর্ট করেছে অ্যামনেস্টি। এতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা কমপক্ষে ২২২ জনকে বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার না করেই হত্যা করা হয়েছে ১৪৯ জনকে। ৩৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে গ্রেপ্তারের পরে। অন্যরা মারা গিয়েছেন নির্যাতন বা অন্য ঘটনায়। কমপক্ষে ৪৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে এমন হত্যার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এর বেশির ভাগই মারা গেছে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযানে। গত বছরে গুমের ঘটনা ঘটেছে ৯টি।

রিপোর্টে বাংলাদেশে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার দিকেও দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, বছরজুড়ে নারীর বিরুদ্ধে কমপক্ষে ২ হাজার ৩৯২টি সহিংসতা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৬২৩টি ধর্ষণ। তার মধ্যে আবার ১২ বছরের কম বয়সী ৩৩১ টি বালিকা ধর্ষিত হয়েছে। ৩২৬টি ঘটেছে উদ্দেশ্যমূলক ধর্ষণ। ৪৪৩টি ঘটেছে শারীরিক অবমাননা। শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্ষণের উদ্দেশে কমপক্ষে ৪৪০ জন নারীকে হত্যা করা হয়েছে।

সূত্র: আমাদের সময়
এম ইউ/০৩ জুলাই ২০২১

Back to top button