জাতীয়

বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তি হচ্ছে না আলোচিত মানি লন্ডারিং মামলা

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

ঢাকা, ২১ জুন – মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা আলোচিত অনেক মামলা বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। স্পর্শকাতর এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। বিচারও চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। দ্রুত নিষ্পত্তি করতে কর্তৃপক্ষের তেমন উদ্যোগ নেই। এসব মামলার একটি বড় অংশ বিদেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত।

সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, আইনি জটিলতা, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আদালতে আসামিপক্ষের সময়ক্ষেপণ, সমন্বয়ের অভাব এবং উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ থাকায় বিচারিক আদালতে মামলার বিচার কার্যক্রম যথাসময়ে শুরু ও নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। ফলে অর্থ পাচার, অবৈধ আর্থিক লেনদেনসহ মানি লন্ডারিং বিষয়ক অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। আলাদা আইন প্রণয়ন ও বিচারের জন্য আদালত প্রতিষ্ঠার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

২০১২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রণয়নের পর এ আইনে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া ৪০৮টি মামলা ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহর এবং পুরোনো জেলার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে আলোচিত মামলার সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০টি। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের আদেশে ৫২টি মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ৮৫টি মামলা ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। ঢাকায় দশটি বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন ১৮৫টি মামলা। নিম্ন আদালতে সাজার বিরুদ্ধে আপিল এবং জামিনের জন্য আসা ১০ থেকে ১৫টি মামলা উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায়। ৪০৮টি মামলার মধ্যে ১৮৭টি দুদকের দায়ের করা। বাকিগুলো দায়ের করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ ছাড়া বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলেও করা অসংখ্য মামলা আদালতে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এরপর করোনার কারণে নিষ্পত্তির প্রবণতা আরও কমে গেছে।

ঢাকার দশটি বিশেষ আদালতসহ বিভাগীয় ও পুরোনো জেলা শহরে মোট ২৯টি বিশেষ জজ আদালত রয়েছে। বিশেষ জজ আদালতে সপ্তাহে এক দিন মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলার বিচার কার্যক্রম হয়ে থাকে। বাকি সময় বিভিন্ন দুর্নীতির মামলার পাশাপশি চাঞ্চল্যকর হত্যা, ডাকাতি, মাদক, চেক ডিজঅনারসহ অন্যান্য ফৌজদারি মামলারও বিচার হয়ে থাকে। করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন থাকায় এসব আদালতে বিচারকাজ আপাতত বন্ধ। গত দেড় বছরেও উল্লেখযোগ্য কোনো মানি লন্ডারিং মামলার রায় আসেনি এসব আদালত থেকে। বিচার-সংশ্নিষ্টদের দাবি, এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত এনে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা সরকারের দায়িত্ব। এখানে আইনের প্রয়োগ দুর্বল। সবক্ষেত্রে সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ হয় না। অর্থ পাচারকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর আদালতের পিপি আব্দুল্লাহ আবু বলেন, করোনার কারণে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে কারোর হাত নেই। পরিস্থিতি ভালো হলে সাক্ষী সমন দিয়ে বিচারের জন্য থাকা মানি লন্ডারিং মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করা হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ে তারিখ দিয়ে সাক্ষ্য নেওয়া হবে। অনেক মামলা চার্জ গঠনের জন্য শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে জাতীয় সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশনে কয়েকজন সংসদ সদস্য সরকারের নিষ্ফ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেন। পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের আইনগত পদক্ষেপ এবং পাচার ঠেকানোর পদক্ষেপ জোরদারের দাবি করেন তারা। গত ১৫ জুন এক মতবিনিময় সভায় দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, মানি লন্ডারিং বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ দরকার। তথ্য-প্রমাণ সঠিক হলে অভিযুক্তরা শাস্তি পাবে।

আলোচিত মামলা: বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর অধিকাংশ মামলা বিচারিক আদালতে আজও শেষ হয়নি। সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে মামলার পুনরায় তদন্ত চলছে। অর্থ পাচারের অভিযোগে ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুদকের দায়ের করা ক্যান্টনমেন্ট থানার মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার বন্ধু বিতর্কিত ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে আসামি করা হয়। এ মামলায় ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত মামুনকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন এবং তারেক রহমানকে খালাস দেওয়া হয়। তারেক রহমানকে খালাস দেওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ২১ জুলাই খালাসের রায় বাতিল করে তারেক রহমানকে সাত বছরের সাজা দেন। মামুন রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলেও তারেক রহমান পলাতক থাকায় আপিল করেননি। তবে কাফরুল থানায় মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলায় ২০১১ সালের ২২ জুন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে ৬ বছর এবং সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) আকবরের ছেলে ইসমাইল হোসেন সায়মন আকবরের একই সাজা দেন আদালত। এ ছাড়া ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডি সোলেমান আনোয়ার চৌধুরীসহ ৯ জনকে ১০ বছর করে সাজা দেন আদালত।

বিএনপি সরকারের সময়ে ২০০৫ সালে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা এরশাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে গুলশান থানায় মামলা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১৬ বছর পর কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চলতি বছর ২ মার্চ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

২০০৭ সালের ৩ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁও থানায় তৎকালীন ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের সাবেক এভিপি তারিকুল ইসলাম খানসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের মাধ্যমে এক নম্বর বিশেষ জজ আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। মামলাটি বর্তমানে এ আদালতে চার্জ গঠনের পর্যায়ে রয়েছে। মামলা দায়েরের পর ১০ বছর পার হয়ে গেছে। মামলাটি চার বছর ধরে বিচার পর্যায়ে রয়েছে।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা ১৮৫টি মামলা ঢাকার দশটি বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যে বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি হাফিজ ইব্রাহিম, ফারমার্স ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক ওরফে বাবুল চিশতী, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. শহিদুল আলম, বরখাস্ত ডিআইজি প্রিজন্স পার্থ গোপাল বণিক, ফরিদপুরের আলোচিত দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন বরকত ও ইমতিয়াজ হাসান রুবেল, পুরান ঢাকার বহিস্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা দুই ভাই এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়া, বহিস্কৃত যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, সাবেক পুলিশ ইন্সপেক্টর ফিরোজ কবীর, ম্যাক্সিম ফাইন্যান্স অ্যান্ড কমার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমানসহ ২০ জন, লয়েড ভিশন প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারমান হোসাইন মাহমুদ রাসেল, আইন কমিশনের সাবেক ড্রাইভার শামসুল আলমসহ অন্যান্যের মামলা রয়েছে।

আইনজ্ঞদের মতামত: সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচারের সময় এসব মামলা ঠুনকো অজুহাতে অহেতুক দীর্ঘ বিলম্ব করা ঠিক নয়। তাহলে অপরাধীরা আইনের ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যেতে পারে। সরকারের উচিত এসব মামলার বিচার পর্যায়ক্রমে শুরু করা এবং মূল অপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা।

অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিনউদ্দিন বলেন, করোনার কারণে অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। মানি লন্ডারিংয়ের মামলাগুলো এখনই শুনানি হওয়া উচিত। উচ্চ আদালতে এ-সংক্রান্ত যেসব মামলা আছে, সেগুলো যাতে দ্রুত শুনানি হয়, তার জন্য তিনি চেষ্টা করবেন বলে জানান।

দুদকের আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘মানি লন্ডারিং মামলার বিচার নিষ্পত্তির বিষয়ে আমরা তৎপর। আমরা চাই বিচারে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কারণ, অর্থ পাচারকারীরা দেশের শত্রু। তারা কোনোভাবেই অনুকম্পা পেতে পারে না। তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং মামলা বিচারের জন্য নির্দিষ্ট আদালত রয়েছে, সেখানে পর্যায়ক্রমে বিচার হচ্ছে।

তদন্ত পর্যায়ে যেসব মামলা: সাবেক এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল, পলাতক পি. কে. (প্রশান্ত কুমার) হালদার, সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, জি কে শামীম, মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরসহ সাতজন, লোকমান হোসেন ভূঁইয়াসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলা আগে তদন্ত করত শুধু দুদক। শুধু তদন্ত নয়, মামলা মনিটরিংও করত সংস্থাটি। তবে ২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশের পর থেকে দুদকসহ পাঁচটি সংস্থা তদন্তের দায়িত্ব পায়। অপর চারটি সংস্থা হলো- পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

সূত্র : সমকাল
এম এউ, ২১ জুন

Back to top button