জাতীয়

গার্ড অব অনারে নারী ইউএনওর বিকল্পের সুপারিশ, সংবিধান কী বলে?

বাহাউদ্দিন ইমরান

ঢাকা, ১৯ জুন – মৃত্যুবরণকারী (শহীদ) বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এমন আনুষ্ঠানিকতায় নারী ইউএনও’র বিকল্প ভাবতে চাইছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গত ১৩ জুন ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে নারী ইউএনওর পরিবর্তে পুরুষ কোনও ব্যক্তিকে দিয়ে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার প্রদানের সুপারিশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। পাশাপাশি দিনের বেলায় গার্ড অব অনার আয়োজনেরও সুপারিশ করা হয়। এমন সুপারিশ চারপাশে সৃষ্টি করেছে আলোচনা-সমালোচনা। আইনজ্ঞরা বলছেন, এসব সুপারিশ আইনগতভাবে গ্রহণ করা হলে তা হবে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

১৩ জুন ওই সুপারিশ সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পর এ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেন, ‘নারী ইউএনও গার্ড অব অনার দিতে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। নারীরা তো জানাজায় থাকতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে নারী কীভাবে গার্ড অব অনার দেন—এ রকম একটা ব্যাপার আরকি। সে জন্য এ বিষয়ে বৈঠকে একটি প্রস্তাব এসেছে। নারীর বিকল্প একজন পুরুষকে দিয়ে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়টি এসেছে। আমরা মন্ত্রণালয়কে এটা পরীক্ষা করে দেখতে বলেছি।’

বিষয়টি চূড়ান্ত আকারে আইনে পরিণত না হলেও আপাত দৃষ্টিতে এ ধরনের সুপারিশ ‘ফতোয়া’র শামিল বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায় অনুসারে ফতোয়া প্রদান একেবারেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, দিন দিন সংসদীয় কমিটিগুলো ফতোয়া দেওয়া শুরু করেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ‘গার্ড অব অনার’ এর বিষয়টিতেও তারা ফতোয়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ এটি কোনও ধর্মীয় প্রথাগত বিষয় নয়, অসাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠান। এর মাধ্যমে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়। তাই ধর্মের অযুহাতে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে নারীদের বঞ্চিত করা হলে তা হবে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক।’

সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক

বিগত বছরগুলোতে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষ তথা নাগরিকদের সমতা ও সমঅধিকারের বিষয়ে বলা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ‘কনভেনশন অন দ্য ইলিমিনেশন অব অল ফরমস অব ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উইমেন (সিডও)’ সনদে ১৯৮৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। সেখানে স্পষ্টভাবে নারীর প্রতি লিঙ্গ বৈষম্য রোধের বিষয়ে বলা হয়েছে। ফলে গার্ড অব অনার প্রদানের ক্ষেত্রে নারী ইউএনও’র বিকল্প ভাবার বিষয়টি হবে অবৈধ।

তাই এমন অসাংবিধানিক সুপারিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৫ জুন মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এফএলএডি) এর আইন ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।

তিনি বলেন, ‘সংসদ যদি ফতোয়া দেওয়া শুরু করে তবে ধীরে ধীরে তা দেশের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠবে। অন্তত এই আধুনিক যুগে এসে ধর্মকে টেনে কোনও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানকে ধর্মীয়করণের মানে হয় না। তাই ভবিষ্যতে যেন এমন সব ফতোয়া আসা বন্ধ হয়, সে বিষয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রিটটি দায়ের করি।’

আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের পরিপন্থী

ইউএন চার্টার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনেও বাংলাদেশের কর্ম প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসনীয়। এসডিজি’র ৫, ৮ ও ১০ নম্বরে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা এবং এ লক্ষ্যে বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করার বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলা রয়েছে। তাই গার্ড অব অনারের ক্ষেত্রে নারীর বিকল্প কোনও সিদ্ধান্ত হবে আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের পরিপন্থী।

অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, ‘নারীদের উন্নয়ন হলে লক্ষমাত্রাও অর্জন ত্বরান্বিত হবে। তাই নারীদের পিছিয়ে রাখার মানসিকতা থেকে উঠে আসতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকেও আইনপ্রণেতাদের বিরত থাকতে হবে।’

ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম বলেন, ‘রিট আবেদনটির শুনানি হাইকোর্ট চার সপ্তাহের জন্য মুলতবি রেখেছেন। এ সময়ের মধ্যে সংসদীয় কমিটি তাদের সুপারিশমালাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত করলে আমরা সঙ্গেই সঙ্গেই তা আদালতের নজরে আনবো। কেননা, এসব সিদ্ধান্ত কখনোই বৈধ কিংবা সংবিধান সম্মত নয়।’

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এম এউ, ১৯ জুন

Back to top button