জাতীয়

স্বাস্থ্যের ১৩০০ কোটি টাকার কেনাকাটা নিয়ে জটিলতা

রাজবংশী রায়

ঢাকা, ১৭ জুন – স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) করোনাকাল শুরুর দিকে প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার কেনাকাটা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৫৭টি প্যাকেজের আওতায় কেনাকাটার বিল পরিশোধের জন্য টাকা ছাড় শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও বিল পরিশোধ করতে চাইছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান ওই কেনাকাটার বিল পরিশোধ করতে চান না।

গত বছর দেশে করোনা সংক্রমণের পর প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদুল্লাহর সময়ে ১৯৬টি প্যাকেজের আওতায় এ কেনাকাটা হয়। কিন্তু কেনাকাটা বাবদ ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয়নি। মোরশেদ জামানের দাবি, যথাযথ নিয়ম মেনে সেই কেনাকাটা করা হয়নি। এ অবস্থায় বিল পরিশোধ করলে অডিট আপত্তি ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই ব্রিগেডিয়ার মো. শহীদুল্লাহর বক্তব্য জানার এখন আর কোনো সুযোগ নেই। করোনা আক্রান্ত হয়ে গত বছর জুলাইয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে প্রয়াত শহীদুল্লাহর মতো একই প্রক্রিয়ায় কেনাকাটা করেই এখন বিল ছাড় করার অভিযোগ উঠেছে বর্তমান পরিচালকের বিরুদ্ধে।

কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর গত বছরের মে মাসে শহীদুল্লাহকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে একটি চিঠি লেখেন। প্রতিবেদকের কাছে ওই চিঠিটি সংরক্ষিত রয়েছে। লিখিত ওই চিঠিতে তিনি কেনাকাটার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি কীভাবে হয়, সে সম্পর্কিত বিশদ বিবরণ ওই চিঠিতে রয়েছে। একই সঙ্গে তার নেতৃত্বে কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়ম মেনে প্রতিটি কেনাকাটা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কেনাকাটার বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধও করেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, জরুরি কেনাকাটায় সেই টাকার কী হবে? সংশ্নিষ্ট ঠিকাদাররা কি আদৌ টাকা পাবেন? মালপত্র সরবরাহ করেও টাকা না পেয়ে ঠিকাদাররা হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। কভিড-১৯ মোকাবিলায় সাপ্লাই চেইন (সরবরাহ ব্যবস্থা) অব্যাহত রাখতে হাইকোর্ট ঠিকাদারদের বিল পরিশোধের নির্দেশনা দেন। এর পরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৯৬টি প্যাকেজের মাধ্যমে কেনাকাটার বিল ১২৮৫ কোটি ২২ লাখ ৪১ হাজার টাকা পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরুর দিকে কেনাকাটার ৫৭টি প্যাকেজে কেনাকাটার বিল বাবদ ৩৪৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা পরিশোধে ভূতাপেক্ষ সম্মতি প্রদানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের অনুকূলে ওই টাকা ছাড় করে। কিন্তু বিল পরিশোধে আপত্তি করেন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক মোরশেদ জামান। গত ২ মে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, কভিড-১৯ মোকাবিলায় সিএমএসডি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংগৃহীত ৫৭টি প্যাকেজের মালপত্রের বিল পরিশোধ বাবদ ৩৪৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা অর্থ বিভাগ থেকে বরাদ্দ করা হয়েছে। ওই বাজেট বরাদ্দ করা হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, ওই কেনাকাটায় প্রযোজ্য আর্থিক বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

বিল পরিশোধ না করার পক্ষে আট যুক্তি :বিল পরিশোধ না করার পক্ষে আটটি কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই কেনাকাটায় পিপিআর, ২০০৮-এর আওতায় সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি, বিপুল অঙ্কের টাকার সংশ্নিষ্টতা থাকলেও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ আদেশ অনুযায়ী অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি, কোনো নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করা হয়নি। জামানত নেওয়া হয়নি, সরবরাহ চুক্তি করা হয়নি, ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন ও চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই সরবরাহ আদেশ বিধিসম্মত হয়নি। কার্যাদেশের বিপরীতে কোনো জরিপ ছাড়াই মালপত্র গ্রহণ করা হয়েছে এবং সর্বোপরি কেনাকাটার সময় কোনো বাজেটও বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়নি।

মোরশেদ জামান লিখেছেন, এসব কারণের মধ্যে সর্বশেষটি নিষ্পত্তি হলেও অন্য সাতটির ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। কারণ, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়কৃত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮ অনুসরণসহ প্রযোজ্য আর্থিক বিধিবিধান যথাযথভাবে পালনের কথা বলা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেট বরাদ্দ হলেও ওই শর্তের কারণে বিল কোনোভাবেই পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।

চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিষয়ে কোনো সাধারণ অব্যাহতি বা ছাড় প্রদান না করে বা অন্য কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক সমাধান না করে বিল পরিশোধ করলে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে। এ অবস্থায় বিষয়গুলোর যৌক্তিক সমাধান করে ২০২০ সালের জুন মাসের আগে, অর্থাৎ ২০১৯-২০ অর্থবছরে সিএমএসডিকে কভিড-১৯ চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সচিবকে অনুরোধ করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের মহাপরিচালক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর একান্ত সচিবকে ওই চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে। মূলত ওই চিঠির পরই বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়টি আটকে গেছে।

মোরশেদ জামানের এই অভিযোগের পর কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের ফাইলপত্র পর্যালোচনা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে ঠিকাদারদের পাঠানো চিঠিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত বছর মার্চের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার কর্তৃপক্ষের আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সরবরাহকারীরা কোটেশন জমা দেন।

ওই কোটেশনের ওপর ভিত্তি করে ওই বছরের ১২ এপ্রিল কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে আনুষ্ঠানিক মূল্য প্রস্তাব ও ডিপিএম দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরবরাহকারীরা আনুষ্ঠানিক মূল্য প্রস্তাবসহ ডিপিএম দরপত্রে অংশগ্রহণ করেন। এরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক, গভর্নমেন্ট প্রেসের সহকারী পরিচালক (প্রেস), পিডব্লিউডির (তেজগাঁও সাবডিভিশন) সাবডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন।

কমিটির সদস্যরা সরবরাহকারীদের সঙ্গে দরকষাকষি করে মূল্য নির্ধারণ করেন। এরপর কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের তৎকালীন পরিচালক ওই বছরের ২ জুন চুক্তিপত্র প্রদানের প্রস্তাবনা অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দসহ ব্যয় মঞ্জুরি প্রদানের জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠান। পরদিন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন আবু হেনা মোরশেদ জামান। এরপর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের পাশাপাশি আগের কর্মকর্তাদের অধিকাংশকে সরিয়ে দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবসহ একাধিক পদেও রদবদল ঘটে। এতে বিল পরিশোধের বিষয়টি আটকে যায়।

এরপর ওই বছরের ১৮ জুন ডিপিএম প্রক্রিয়ার কেনাকাটা সম্পন্ন করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে মন্ত্রিসভার কমিটির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। ২০ জুন এক বৈঠকে ডিপিএম প্রক্রিয়ায় কেনাকাটার জন্য মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়। ২৩ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়, ২০ জুন সার্কুলেশনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়।

মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত হিসেবে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী সদয় অনুমোদন করবেন- এ প্রত্যাশায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে ও জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণপূর্বক বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসামগ্রী ও সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য পিপিআর, ২০০৮-এর বিধি-৭৬(২) এ উল্লিখিত মূল্যসীমার ঊর্ধ্বের ক্রয়প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে নীতিগত অনুমোদন করা হলো। পরে প্রধানমন্ত্রী ওই প্রস্তাব অনুমোদনও করেন।

এরপর ২৪ জুন কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে এক সভা আহ্বান করা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন। ওই সভায় সুরক্ষাসামগ্রী ও নমুনা পরীক্ষার কিটের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরবরাহকারীদের বকেয়া বিল পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়। প্রয়োজনে যাচাই-বাছাই করে বিল পরিশোধের বিষয়ে উপস্থিত সবাই একমত পোষণ করেন।

বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য ওই বছরের ৫ জুলাই কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক মোরশেদ জামান স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘ইতোপূর্বে পিসিআর কিট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের ৮৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং ভিটিএম ও সোয়াব স্টিকের ৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার বিল না পেলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং নতুন করে পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করবে না। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে ২৭৯ কোটি ৪৮ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা পাওয়া না গেলে বড় বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহকারীদের চুক্তি অনুযায়ী বিল পরিশোধ করা যাবে না। এতে জরুরি মেডিকেল সামগ্রীর সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হবে। এতে তীব্র জনঅসন্তোষ তৈরি হবে এবং সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। সর্বোপরি বিপর্যয়কর পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। সরকারের ভাবমূর্তি সমুজ্জ্বল রাখার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কেনাকাটার জন্য কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের অনুকূলে ৪৯৮ কোটি ৫০ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা ছাড় করার অনুরোধ করা হলো।’ ওই টাকা ছাড় করার পরও বকেয়া বিল আটকেই থাকল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উপহার হিসেবে চীনে পাঠানো চিকিৎসাসামগ্রী বিলও পরিশোধ করা হয়নি।

একই পদ্ধতিতে কিনছেন বর্তমান পরিচালকও :সিএমএসডি পরিচালক বলছেন, বিল ছাড় পরিশোধ করলে দুর্নীতির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে। অথচ একই পন্থায় তিনিও এখন শত শত কোটি টাকার কার্যাদেশ প্রদান করে বিল ছাড় করেছেন। এমন কয়েকটি কাগজপত্র প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। জিএস বায়োটেক নামে একটি প্রতিষ্ঠান নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) ইস্যু ছাড়াই ৯ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ আরটি পিসিআর কিট নিয়েছে। একই সঙ্গে চুক্তি না থাকার কারণে আগের বিল আটকে দিলেও জিএস বায়োটেকের কাছ থেকে কিট কিনছেন কোনোরকম চুক্তি ছাড়াই।

সরকারি ক্রয় বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী, এ পদ্ধতিতে যে কোনো সামগ্রী সরবরাহের আগে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধানের মাধ্যমে ক্রয়প্রস্তাবের অনুমোদন পেতে হয়। আনুষ্ঠানিক দরকষাকষির পর দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দাম নির্ধারণ করবে। এ প্রক্রিয়া শেষে অনুমোদনের পর নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করে জামানত রেখে কার্যসম্পাদন চুক্তি করে সরবরাহ আদেশ প্রদান করতে হবে। কিন্তু জিএস বায়োটেকের কাছ থেকে নমুনা পরীক্ষা কিট ক্রয়ের ক্ষেত্রে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।

একাধিক সূত্র বলছে, সরকারি সরবরাহ কাজে কোনো প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু জিএস বায়োটেক নামে এই প্রতিষ্ঠানের কিট কিংবা স্বাস্থ্য খাতে কোনো সামগ্রী সরবরাহের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত পোশাক প্রস্তুত করার কাজে যুক্ত।

মোরশেদ জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রতিষ্ঠান একই পদ্ধতিতে পিপিই ও কিট সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পরপর গত বছরের ১৫ জুন তিনি মেসার্স জেরিন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দেড় লাখ কিট কেনার কার্যাদেশ দেন। ওই কিটের মূল্য ধরা হয় ৩৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ওই প্রতিষ্ঠানটিরও স্বাস্থ্য খাতে কাজের কোনো পূূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। একই সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানটির মালিক স্বাস্থ্য খাতের আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর আত্মীয়। মূলত আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিট সরবরাহ করেন ওই ঠিকাদার।

এদিকে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে সরবরাহকৃত পণ্যের মান, সংখ্যা, মূল্য ও ক্রয় প্রক্রিয়া যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনা হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিল পরিশোধে প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়া অন্য কোনো কারণ খুঁজে পায়নি কমিটি।

পরিচালকের বক্তব্য :বকেয়া বিলের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক মোরশেদ জামান বলেন, বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি চিঠি দিয়েছি। কিন্তু এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি। অর্থ ছাড় করা থাকলেও নিয়ম অনুযায়ী না হলে তা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এটি ছাড় করতে গেলে তাকে অভিযুক্ত হতে হবে।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে পরিচালক বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে স্বচ্ছতার সঙ্গে তিনি কাজ করে চলেছেন এবং সার্বিক বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও অবহিত। কে কী বলল, তাতে কিছু যায়-আসে না। কাগজপত্র ঠিক থাকা এবং নিয়মমাফিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে কিনা, সেটি মূল বিষয়।

কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে কাজের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কোনো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রত্যয়ন করলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারবে। তেমনটি বলা আছে। সুতরাং এটি তাদের দেখার বিষয়। কার প্রতিষ্ঠান কাজ করল কিংবা অভিজ্ঞতা আছে কিনা, সেটি কেন্দ্রীয় ঔষধাগার দেখবে না। সর্বনিম্ন দরদাতা হয়ে কাজটি নিতে হবে এবং সঠিকভাবে পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করল কিনা, এটি দেখার কাজ কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের।

ডিপিএমে কেনাকাটার মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক বলেন, তার সময়ে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ওই অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। আগের পরিচালক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। এর বাইরে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন বলেও জানান।

আশ্বস্ত করলেন মন্ত্রী :এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সরবরাহকারীরা নিজেরা জোর করে এসব সামগ্রী কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে সরবরাহ করেননি। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করেছেন। সুতরাং তারা বিল পাবেন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কিছু জটিলতা রয়েছে। এটি কোন প্রক্রিয়ায় সুরাহা করা যায়, তা ভাবা হচ্ছে।

সূত্র : সমকাল
এন এইচ, ১৭ জুন

Back to top button