সিলেট

সিলেট বিএনপিতে আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তু ‘চৌধুরীরা’

জুনেদ আহমদ চৌধুরী

সিলেট, ১৭ জুন – সিলেট বিএনপিতে বার বার আলোচনা-সমালোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছেন ‘চৌধুরীরা’। এই বংশীয় নেতারা ঘটাচ্ছেন দলছুট কাণ্ড, কখনো নিচ্ছেন দলের বিরুদ্ধে অবস্থান।

আবার কখনো নিরুদ্দেশ হয়েও বিএনপিতে আলোচনায় আসছেন ‘চৌধুরী’ ব্যক্তিরা।

সর্বশেষ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সিলেট-৩ আসনের সাবেক সাংসদ শফি চৌধুরী দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। এতে সিলেটজুড়ে বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে খোদ বিএনপির নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমালোচনা করছেন শফি চৌধুরীর। তবে এ ‘চৌধুরী’ এসবের তোয়াক্কা না করে বলেছেন- বিএনপি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তিনি নির্বাচন করবেন।

জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর থেকে শফি চৌধুরীকে শোকজ করা হয়েছে। দল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করাও হতে পারে- এমন আভাসও দিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল এক নেতা।

বিএনপির রাজনীতির জাতীয় পর্যায়ে সিলেটীদের- বিশেষ করে সিলেটী ‘চৌধুরী’ ব্যক্তিদের দাপট ছিলো সবসময়। কিন্তু এতে প্রথমেই চিড় ধরিয়েছেন সিলেটের শমসের মবিন চৌধুরী। তিনি ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান। সিলেট বিএনপিতে এক সময় তার প্রভাব ছিলো উল্লেখযোগ্য। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকাকালে শমসের মবিন চৌধুরী ছিলেন পররাষ্ট্রসচিব।

২০০৫ সালে তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৭ সালে তিনি অবসরে যান। ২০০৮ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। আর ২০০৯ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

২০১৫ সালে ঢাকার বাসা থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় এই নেতা (শমসের মবিন চৌধুরী) ডিবি পুলিশের হাতে আটক হন। একই বছরের ২২ মে তিনি কারামুক্ত হন। মুক্তির পর একই বছরের ২৮ অক্টোবর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উদ্দেশে লেখা এক চিঠির মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতি থেকে তিনি সরে দাঁড়ান শমসের মবিন। এর পরদিন অবসরে যাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান তিনি।

ওই চিঠিতে তিনি লেখেন, আমি যুদ্ধাহত একজন মুক্তিযোদ্ধা। শারীরিকভাবে এখন আর রাজনীতি করার মতো অবস্থায় নেই। এ কারণে বিএনপির সব পদ থেকে পদত্যাগ করে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

রাজনীতিতে থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেও ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারায় যোগ দিয়ে আবার রাজনীতিতে ফেরেন। তাঁর রাজনীতি থেকে অবসর এবং পরে আবার রাজনীতিতে ফেরায় সারা দেশে বিএনপি- বিশেষ করে সিলেট বিএনপি বেশ সমালোচনার মুখে পড়ে।

এরপর আলোচনায় আসেন সিলেটের ইনাম আহমেদ চৌধুরী। তিনি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান, ছিলেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাও। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের চেয়ারম্যানও ছিলেন। পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী গাড়ি দৌঁড়ান বিএনপির বদৌলতে।

অথচ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় দল ত্যাগ করতে সময় ক্ষেপণ করেননি বিএনপির সাবেক এই প্রভাবশালী নেতা। বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে তিনি ২০১৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনীত হন বিএনপির সাবেক এই ভাইস চেয়ারম্যান।

বিগত জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ইনাম আহমেদ চৌধুরী দল ছাড়লে সিলেটে বিএনপির নেতাকর্মীদের আরেকদফা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। সে সময় শমসের মবিন চৌধুরী ও ইনাম আহমদ চৌধুরীকে নিয়ে ট্রল হয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই দুই চৌধুরীকে নিয়ে অনেকেই সে সময় নানা রকমের বিরূপ মন্তব্যও করেন।

সর্বশেষ সিলেট-৩ আসনের উপনির্বাচনে এই আসনের দুইবারের সাবেক সাংসদ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শফি আহমদ চৌধুরী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় আবারও শুরু হয়েছে সমালোচনা। আবারও সিলেট বিএনপিকে তোপের মুখে ফেলে দিলেন আরেক ‘চৌধুরী’।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে দলের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে লেখালেখি করে বিরূপ মন্তব্য করছেন বিএনপি ও শফি চৌধুরীকে নিয়ে। চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে রাজনীতি সচেতন গৃহিনীর রান্নাঘর- সর্বত্রই চলছে শফি চৌধুরীকে নিয়ে সমালোচনা।

দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, ৮২ বছর বয়সের শফি চৌধুরী বিএনপির বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন না করলেও পারতেন। জীবন সায়ান্সে দাঁড়িয়ে তাঁর এই ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া একবোরেই উচিতত হয়নি।

এদিকে, সিলেটে বিএনপির নেতাকর্মী অনেকেই ফেসবুকে ‘চৌধুরী নিয়ে সন্দেহ’ করে লেখালেখি করছেন। অনেকেই লিখেছেন- বিএনপির চৌধুরীরা আজ ‘ডাইভারড’ হচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে তারা শমসের মবিন চৌধুরী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী ও শফি আহমদ চৌধুরীর কথা উল্লেখ করছেন।

সিলেটে বিএনপির এই ৩ শীর্ষ নেতা ছাড়াও আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন দলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরী। দেশে ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশ ছাড়ার খবর চাউর হয় হারিছ চৌধুরীকে নিয়ে। ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। হারিছ চৌধুরীর বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়।

এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে নিয়েও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে সন্দেহ-বিভক্তি। গেল জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে জয়লাভ করা ও পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর ড. এ কে আব্দুল মোমেনকে আরিফুল হক চৌধুরী ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

এসময় সিলেটে গুঞ্জণ উঠে- মেয়র আরিফও দল ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে এমন গুঞ্জণ উঠার পর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ঘোষণা দেন- তিনি মৃত্যু পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতি-ই করে যাবেন।

সূত্র : সিলেটভিউ
এন এইচ, ১৭ জুন

Back to top button