মুক্তমঞ্চ

বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার জরুরি

মাহফুজ আনাম

সহজ কথায় বলতে গেলে এটি একটি ‘প্রক্রিয়া বনাম ধৈর্য’ বিষয়ক সমস্যা। যার অর্থ হলো— ‘আমলাতন্ত্র বনাম চূড়ান্ত উপকারভোগীর’ মধ্যকার দ্বন্দ্ব। আমাদের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে কাজ করতে হবে, তা না হলে সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তবে, এই সময়ে বিশেষ করে মহামারিকালে এ দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, সে বিষয়ে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। ‘ধৈর্য’ মনোযোগের কেন্দ্রে থাকতে পারতো কিন্তু মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রক্রিয়া বা ‘আমলাতন্ত্র’— অর্থাৎ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ।

এ থেকে বোঝা যায়, গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে কেনো উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ২৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। জরুরি কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যেখানে গত অর্থবছরের ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ অব্যবহৃত ছিল, সেখানে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার অভাবে রোগী মারা গেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার পরও একটার পর একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে থাকে। দেশজুড়ে অসুস্থ মানুষ অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে লাগলেন, বিশেষ করে ঢাকা শহরে। আর এদিকে মন্ত্রণালয় জনগণের কর দেওয়া টাকা খরচ করে অসুস্থ মানুষের জরুরি সেবা দেওয়ার কোনো পথ খুঁজে পেল না।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের গত রোববারের মন্তব্যে উপরের বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ৬ জুন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচেম) একটি ওয়েবিনারে অংশ নিয়ে মন্তব্য করেন, উচ্চ শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশের আমলারা সময় মতো বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষ নন, যে কারণে বহু বছর ধরে এই সমস্যাগুলো চলে আসছে। ‘আমাদের আমলাতন্ত্রকে আরও সংস্কার করতে হবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমরা স্মরণ করতে পারি, সারাবিশ্বকে অচল করে দেওয়া এই অজানা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সারাদেশে কীভাবে অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছিল। সেসময় গবেষণার জন্য বরাদ্দ করা ১০০ কোটি টাকা অব্যবহৃত পড়ে ছিল, কারণ আমলারা গবেষণা প্রক্রিয়ার বিষয়ে একমত হতে পারেননি— অভীষ্ট লক্ষ্যকে প্রক্রিয়ার কাছে হেনস্থা হওয়ার আরেকটি উদাহরণ এটি।

মানব জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয় এরকম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গণসেবামূলক সংস্থা শুধু আমলাতান্ত্রিক মূলনীতির ভিত্তিতে চলতে পারে না। সর্বোপরি, কোভিডের কারণে আমরা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে দেখেছি যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো একটি সংস্থার প্রধানকে অবশ্যই একজন পেশাদারী স্বাস্থ্যকর্মী হতে হবে। এ ছাড়া, মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মীদের মধ্যেও পেশাদারদের প্রাধান্য থাকতে হবে, যারা এই সমস্যাগুলোকে ভালো করে বুঝতে পারেন এবং যারা সারাজীবন মানুষের সেবা করার শ্রেষ্ঠ প্রক্রিয়াগুলোকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। মন্ত্রণালয়ের কাজের সঙ্গে অবশ্যই একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো এবং বিবিধ কার্যধারা জড়িয়ে থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বর্তমানের মতো সে বিষয়গুলোর এত বেশি গুরুত্বে থাকা উচিত নয়।

বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটি এত বেশি জটিলতাপূর্ণ যে, এখানে পেশাদাররা সবসময় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার পরিধির বাইরে থাকেন। এর একটি দৃষ্টান্ত কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শ, যেখানে মূলত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং পেশাদাররা কাজ করেছেন। এটি এপ্রিল ২০২০ সালে গঠন করা হয়েছিল এবং এই কমিটির মেয়াদের বেশিরভাগ সময় জুড়ে তাদের সুপারিশগুলোকে ধর্তব্যে নেওয়া হয়নি। এতদিন পর সম্প্রতিকালে তাদের কিছু সুপারিশ সরকারের উঁচু মহলে পৌঁছুতে পেরেছে, যা এই আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্বের ব্যর্থতাকে প্রমাণ করেছে। আমরা মনে করি, যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে পরিচালিত হতো, তাহলে তাদের কাজের গুণগত মান নাটকীয়ভাবে বেড়ে যেত। একটা সময় ছিল যখন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ পদগুলোতে পেশাদার স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু সেসব দিন বিগত হয়েছে অনেক আগেই। আমরা পুরনো দিনকে ফিরিয়ে আনার উপদেশ দিচ্ছি না, কিন্তু আমরা স্বাস্থ্য খাতে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সংস্কার ও নতুন চিন্তাধারা নিয়ে আসার কথা বলছি, যাতে এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি যাদের উপকারের জন্য তৈরি করা হয়েছে— সেই গণমানুষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

মজার বিষয় হলো, উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছে অন্যতম বিস্তৃত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক (সিসি) রয়েছে। এ ছাড়া, প্রায় ৪২১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (ইউএইচসি) সঙ্গে ইউএইচসিগুলোর অধীনে উপজেলা পর্যায়ে পরিচালিত আরও এক হাজার ৩১২টি ইউনিয়ন উপকেন্দ্র ও বিশেষায়িত সেবা সমৃদ্ধ আরও ৬২টি জেলাভিত্তিক হাসপাতাল এবং সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে সর্বোচ্চ স্তর। কমিউনিটি, প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং সর্বোচ্চ— এই চার স্তরভিত্তিক বিন্যাস আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। এ ছাড়া, দেশে আরও পাঁচ হাজার ৩২১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এবং নয় হাজার ৫২৯টি নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে।

তবে, আমরা আগে অসংখ্যবার জানিয়েছি যে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে যোগ্য মানবসম্পদের অভাব রয়েছে। যেমন: ডাক্তার, নার্স ও মেডিকেল টেকনিশিয়ানের সঙ্গে অভাব রয়েছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেরও। যুগ যুগ ধরে এই সমীহ করার মতো স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ-সুবিধাগুলো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবে মূলত অব্যবহৃতই থেকে গেছে।

আমরা কতটুকু চ্যালেঞ্জিং একটি পরিস্থিতিতে আছি, তা প্রাথমিক কিছু পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়। ২০১৯ সালের আনুষ্ঠানিক ‘স্বাস্থ্য বুলেটিন’ অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ছয় দশমিক ৭৩ জন নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন। ১০ হাজার মানুষের জন্য সরাসরি সরকারি নিয়োগে আছেন এক দশমিক ৫৫ জন ডাক্তার, শূন্য দশমিক ৮৮ জন নার্স এবং শূন্য দশমিক ৬০ জন মেডিকেল টেকনিশিয়ান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ ২০১৯ সালে মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত হচ্ছে একটি ‘ঘোড়ায় টানা গাড়ি, যার কোনো ঘোড়া নেই— এটি একটি সুবিশাল অবকাঠামো, যার রয়েছে তীব্র মানবসম্পদ স্বল্পতা’। জনসংখ্যা বনাম স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের অনুপাত থেকে আমরা খুব সহজেই স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও উপযোগিতা সম্পর্কে পরিষ্কার একটি ধারণা পাই। এর সঙ্গে অনুপস্থিতির হারকে সংযুক্ত করলে বাস্তবচিত্রটি প্রকৃত করুণ আকার ধারণ করে।

এই পরিস্থিতির রাতারাতি পরিবর্তন আনতে হলে আমাদেরকে একেবারে নিচ থেকে কাজ শুরু করতে হবে। আমরা যদি শুধু কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে নিয়ে কাজ করি এবং তাদেরকে ছোট, কিন্তু কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারি, তাহলেই আমরা স্বাস্থ্যখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারব। বর্তমানে সিসিগুলোর অস্তিত্ব শুধু নামে, সেগুলো একেবারেই কার্যকরী নয় এবং এগুলো কারও কোনো উপকারে আসার মতো পর্যায়ে নেই। এগুলোর পরিচালনার দায়িত্বে একজন কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা দাতা থাকেন, যার পেশাদারী যোগ্যতা নিয়ে কোনো কথা না বলাই ভালো। তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের এবং তারা মূলত গর্ভধারণ সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো জানেন। তারা অন্য কোনো চিকিৎসার ব্যাপারে খুব একটা সহায়তা করতে পারেন না। আমরা এই খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে কাজ শুরু করতে পারি।

পরের ধাপে রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, যার দায়িত্বে থাকেন একজন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক বাজেট থাকে এক কোটি টাকা। বিস্ময়কর না হলেও, মজার ব্যাপার হচ্ছে—­­ তাদের এই অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য নেই। একটি ইউএইচসিতে ডিজিটাল এক্স-রে যন্ত্র, আলট্রাসাউন্ড যন্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম থাকে। তবে, টেকনিক্যাল কর্মী, ডাক্তার ও নার্সদের নিয়মিত অনুপস্থিতির কারণে মানুষ এখান থেকে তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। আবারও যোগ্য মেডিকেল কর্মীর অভাবকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এটি বিনিয়োগ করার জন্য আরেকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র।

উপরের ঘটনাগুলোকে বিবেচনা করলে, কীভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়য় তাদের জন্য বরাদ্দ করা ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বাজেটের শুধু একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যয় করার ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করবে? আগামী অর্থবছরের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। যার মধ্যে আগের মতোই কোভিড-১৯ সংকটের জন্য আলাদা করে ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রয়েছে। স্বাস্থ্যখাতে কোনো ধরনের সংস্কার করা না হলে আগামী বছরও ফলাফল একইরকম থাকবে, ঠিক নয় কি? বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএস) আয়োজিত একটি ওয়েবিনারে গত ৯ জুন অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি অবাক হয়ে দেখলাম যে, আমরা মহামারির মধ্যে তাদের যে পরিমাণ তহবিল দিলাম তার একটি বড় অংশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খরচই করতে পারল না।’

প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার কিংবা সিসি ও ইউএইচসি পর্যায়ে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার ব্যাপারে কোনো আভাসও দেওয়া হয়নি।

আমরা নিজেদেরকে এরকম কোনো ধোঁয়াশার মাঝে না রাখি যে, অর্থ ব্যয় বাড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে উন্নত স্বাস্থ্য সেবা পাওয়া যাবে। এতে বরং দুর্নীতি বাড়তে পারে, যেরকম আমরা দেখেছি নিকট অতীতে। এমনকি মহামারির মধ্যেও জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে অনিয়ম ঘটেছে নিয়মিতভাবে। উদাহরণস্বরূপ: ৩৫০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির কথা বলা যায়। যেখানে ডাক্তারদের প্রতিবাদের মুখে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালককে অপসারণ করা হয়। এখানে মজার ব্যাপার হচ্ছে, অপমানিত পরিচালক একটি চিঠির মাধ্যমে অভিযোগ জানান এবং দাবি করেন যে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেট’ কার্যকর রয়েছে, যারা মূলত মন্ত্রণালয়ের বড় ধরনের সব দুর্নীতির জন্য দায়ী। তার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো ধরণের অনুসন্ধান বা তদন্ত হয়নি। একটা সময় ছিল যখন এ ধরনের অভিযোগ আসলে তা খতিয়ে দেখা ছিল প্রথাগত ব্যাপার। কিন্তু সে পরিস্থিতি আর নেই, কারণ এখন কোনো জবাবদিহিও নেই।

আমরা রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথকেয়ার কোম্পানির কেলেঙ্কারি এবং সেটির সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্র উন্মোচিত হওয়ার কথা স্মরণ করছি। আমরা গাড়িচালক আবদুল মালেকের ঘটনাটিও ভুলিনি, যিনি ১০০ কোটি টাকা সম্পদের মালিক ছিলেন এবং যার আয়ের মূল উৎস ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ড্রাইভার হিসেবে নিজের প্রভাবকে বিভিন্নভাবে কাজে লাগানো। র‍্যাব তাকে গ্রেপ্তার করলেও সেখান থেকে তেমন কোনো তথ্য বের হয়ে আসেনি। আমরা আরও স্মরণ করছি যে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে স্বাস্থ্য খাতে, বিশেষ করে যন্ত্র-অস্ত্রোপচারের উপকরণ, ওষুধ ইত্যাদি কেনার ক্ষেত্রে ঘুষ আদানপ্রদানের উৎস চিহ্নিত করলেও, সে ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে আবার যখন দুর্নীতির ঘটনা সবার সামনে এল, তখন দুদকের চেয়ারম্যান বললেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি গত বছরে দুদকের দেওয়া সুপারিশগুলোকে মেনে চলতো, তাহলে স্বাস্থ্য খাতে অবাধ দুর্নীতির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসতো।’

বড় আকারের বরাদ্দ এবং ব্যয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করতে হবে। সার্বিকভাবে মন্ত্রণালয়ের সব ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে ক্রয় সংক্রান্ত জায়গাগুলোতে যেখানে দুর্নীতির সুযোগ সবচেয়ে বেশি, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কঠোর প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ এখন আমাদেরকে দংশন করছে। আমরা প্রথমবার ভালোই করেছি, যদিও আমরা নিশ্চিত নই কীভাবে তা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয়বার আমরা আর আগের মতো ভাগ্যবান নাও হতে পারি। এ কারণে স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত সংস্কার আবশ্যক। অতীব জরুরি কাজ হিসেবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর মধ্যে আরও বেশি সংখ্যক পেশাদারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরকে নিয়ে আসতে হবে। বর্তমান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সংযুক্তি বাড়াতে হবে এবং তাদের হাতে আরও ক্ষমতা দিতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার বিস্তার ঘটানোর জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ২০১৯ সালে দুদকের দেওয়া সুপারিশগুলো মন্ত্রণালয়কে আবারও বিবেচনায় আনতে হবে এবং আগামীতে সেখান থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই মন্ত্রণালয়টি অধিক অর্থ ব্যয় করে এবং আমরা চাই এটা যত বেশি ব্যয় করবে, এটা তত বড় আকারের দুর্নীতি ও অপচয় ঠেকানোর উদ্যোগ নেবে। এই মুহূর্তে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বড়, অনেক বেশি কর্মী সমৃদ্ধ এবং এটি অনেক বেশি অর্থের লেনদেন করে থাকে। এটিকে বিশেষায়িত খাতের জন্য ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা উচিত, যেগুলো স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরিচালনা করবেন, আমলারা নয়।

এই মহামারি হচ্ছে এমন একটি সংকট যার প্রকৃত রূপ এখনো আমাদের অজানা। ভাইরাসটির প্রায় প্রতিনিয়তই মিউটেশন হচ্ছে এবং তা সারাবিশ্ব এবং আমাদের জন্য নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। আমাদেরকে এর বর্তমান রূপই নয় শুধু, বরং এর নতুন রূপগুলোর জন্যেও প্রস্তুতি নিতে হবে এবং একইসঙ্গে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা আরও নতুন সব মহামারির জন্যেও প্রস্তুত থাকতে হবে। সারাবিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদেরকে বারবার একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ব্যাপারে সতর্ক করছে। এই সর্বদা মিউটেশন ঘটতে থাকা ভাইরাসটি এবং অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মোকাবিলা করার জন্য আমাদেরকে একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার করে এটিকে আরও কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক করতে হবে এবং এই খাতকে পেশাদার ও গণমানুষের প্রতি সংবেদনশীল মানুষদের দিয়ে পরিচালনা করতে হবে।

এই মাহেন্দ্রক্ষণে জেগে উঠতে না পারলে তা হবে এমনই একটি ব্যর্থতা, যার ফলাফল আমাদের কাছে একেবারেই অজানা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়ায় কোনো অধিকার আমাদের নেই।

এম ইউ/১১ জুন ২০২১

 

Back to top button