নারায়নগঞ্জ

না.গঞ্জে ৩৩৩ কাণ্ডে ইউপি সদস্যকে দোষী সাজিয়ে ইউএনওকে দায়মুক্তি

নারায়ণগঞ্জ, ০৬ জুন – জাতীয় জরুরি তথ্য সেবা নম্বর ৩৩৩-এ কল করে খাদ্যসহায়তা চাওয়ার ‘অপরাধে’ বৃদ্ধ ফরিদ আহমেদকে জরিমানা হিসেবে ১০০ প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সাজা দিয়েছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আরিফা জহুরা। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক জলঘোলা হয়। শেষ পর্যন্ত এ ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি দোষী সাব্যস্ত করেছে স্থানীয় কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আইয়ুব আলীকে। তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছেন স্থানীয়রা।

বৃহস্পতিবার রাতে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামীম ব্যাপারী জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউপি সদস্যের ভুল তথ্যের জন্যই এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি (ইউপি সদস্য) ইউএনওকে আগে-পরে তথ্য দিয়ে কোনো সহযোগিতা করেননি।

গত ২৩ মে ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চান নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের দেওভোগ এলাকার ফরিদ আহমেদ। খবর পেয়ে ইউএনও আরিফা জহুরা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ছুটে যান ফরিদ আহম্মেদের বাড়িতে। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে ইউএনও দেখতে পান ফরিদ আহমেদ চারতলা ভবনের ভবনের মালিক।

এরপর ফরিদ মিয়ার পরিবারের খোঁজ খবর না নিয়ে স্থানীয় ইউপি মেম্বারসহ লোকজনের উপস্থিতিতে ফরিদ আহমেদকে জরিমানা করেন ইউএনও।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভুক্তভোগী ফরিদ মিয়াসহ এলাকাবাসী সাজা মওকুফের অনুরোধ জানালেও ইউএনও তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে জরিমানা করেন। পরে নির্ধারিত দিনে জরিমানার খাদ্যসামগ্রী তিনি নিজে বিতরণ করেন। কিন্তু ওই জরিমানার অর্থের ব্যবস্থা করতে কষ্ট করতে হয়েছে ফরিদ আহমেদের।

বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা সৃষ্টি হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বিষয়টি নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

তবে তদন্ত কমিটি ইউএনওকে ‘বাঁচিয়ে’ স্থানীয় ইউপি মেম্বারকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, আগামীকাল (রোববার) প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার রাতেই জমা দেয়।

পাঁচ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের সঙ্গে ১২৬ পৃষ্ঠার কাগজপত্র ও ভিডিও সংযুক্ত করা হয়েছে। সুপারিশ করা হয়েছে মানবিক খাদ্য সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে একজনের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, মসজিদের ইমাম ও প্রয়োজনে সাংবাদিকদের কাছ থেকে তথ্য নেয়া যেতে পারে।

সম্প্রতি ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্যসহায়তা চান কাশিপুর ইউনিয়নের দেওভোগ এলাকার ফরিদ আহমেদ। এরপর তাঁর চারতলা বাড়ি ও হোসিয়ারি কারখানা থাকার খবর পেয়ে খাদ্যসহায়তা না দিয়ে উল্টো দুই দিনের মধ্যে ১০০ জনের মধ্যে খাদ্য বিতরণের সময় বেঁধে দেন ইউএনও আরিফা জহুরা। এ নির্দেশনা না মানলে তিন মাসের জেল হতে পারে বলে তখন ফরিদকে জানান ইউপি সদস্য আইয়ুব।

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি ইউএনওর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনার জন্য তদন্ত কমিটি ইউএনওকে দায়ী বা সতর্ক করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

গত ২৩ মে ফরিদ আহমেদ দৈনিক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, দেওভোগ পঞ্চায়েত কমিটির উপদেষ্টা শাহীনূর আলম তাকে খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য ৬০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। সে সময় প্রশাসনের কেউ ভুল করেননি, তার (ফরিদ) কোনো অভিযোগও নেই এবং নিজের ভুলের কারণে এমন হয়েছে মর্মে সই নেয়া হয়।

ফরিদ আহমেদের খাদ্যসহায়তা চাওয়ার ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর আলোচনার শুরু হয়। পরে জানা যায় ফরিদ আহমেদ হোসিয়ারি কারখানায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। তার এক ছেলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও দুই মেয়ে আছে। বড় মেয়ের অলংকার বন্ধক রেখে চড়া সুদে ঋণ ও ধার করা টাকায় ইউএনওর নির্দেশ অনুযায়ী খাবার বিতরণ করেন ফরিদ।

ইউপি সদস্য আইয়ুব আলী বলেন, তিনি ওই ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে। ইউএনও স্যার নিজে ঘটনাস্থলে এসে ফরিদ আহমেদকে জরিমানা করেন। এখানে আমার দোষ কোথায় আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। ‘আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। ওই ব্যক্তির (ফরিদ আহমেদ) ১০০ প্যাকেট খাবার দেয়ার সামর্থ্য নেই, বিষয়টি ইউএনও অফিসে আমি বারবার জানিয়েছি। খাদ্য বিতরণের জন্য নিজে ফরিদকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। আমার অপরাধ কোথায় আমি নিজেও জানি না৷ আল্লাহ সব কিছুর বিচার করবেন।

এদিকে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা হয় কাশিপুরের দেওভোগ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলার পর তারা বলেন, ফরিদ আহমেদকে শাস্তি দেন ইউএনও ম্যাডাম। ফরিদের টাকায় কেনা খাবার ইউএনওই বিতরণ করেন। অথচ ইউএনওর ভুলের দায় ইউপি সদস্যের ওপর চাপানো হয়েছে। এতে বোঝা যায় তদন্ত কমিটি পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ইউএনও প্রশাসনের লোক হওয়ায় তাকে দায়মুক্ত করে নিরীহ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আইয়ুব আলীকে দায়ী করলেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে কমিটির আহ্বায়ক শামীম ব্যাপারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘মিটিংয়ে আছেন’ জানিয়ে আর কথা বলতে রাজি হননি।

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ০৬ জুন

Back to top button