মুক্তমঞ্চ

‘আউট অব বক্স’ গেলেন না অর্থমন্ত্রী

ড. আতিউর রহমান

আমরা যতটা ‘আউট অব বক্স’ বাজেট আশা করেছিলাম, তা পাইনি। বাস্তবতার নিরিখেই হয়তো সতর্ক এবং অনেকটাই গতানুগতিক বাজেট দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সবার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল স্বাস্থ্যে বরাদ্দ। গত বছরের জুনে করোনার মধ্যেই যখন চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছিল, তখন স্বাস্থ্যে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। আসন্ন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তা প্রায় ১২ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। কিন্তু মোট বাজেটের শতাংশ হিসাবে এ বরাদ্দ বরাবরের মতো ৫ শতাংশের আশপাশেই আটকে আছে (৫.৪ শতাংশ)। আমরা আশা করেছিলাম, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যে অন্তত ৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে। কারণ, করোনার প্রকোপ যেদিকে যাচ্ছে, তাতে এমন বাড়তি বরাদ্দ জরুরি। তবে এখনই গোটা বাজেট নিয়ে চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। সদ্যই বাজেট প্রস্তাবিত হয়েছে। আগামী কয়েক দিন বাজেটের তথ্য-উপাত্তগুলো আরও বিশ্নেষণ করা যাবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকেও আরও ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। তখন হয়তো গুণবাচক পরিবর্তনগুলো আমাদের সামনে স্পষ্ট হবে।

তবে এটা এখনই বলা যায়, বাজেটটি অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং সামাজিক সুরক্ষায় বেশি জোর দিয়েছে। তার মানে বাজটটি একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি এবং মানবিক উন্নয়নে বিশ্বাসী।

সামাজিক সুরক্ষায় মোট বাজেটের ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩০ হাজার কোটি টাকার কম। আসন্ন ২০২১-২২-এ প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। বরাদ্দের এ বৃদ্ধি থেকে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতাবস্থায় বিপর্যস্ত দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে রক্ষা করতে কতটা মনোযোগী, তা বোঝা যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন করে দরিদ্র হওয়া পরিবারগুলো এবং নগরাঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত থাকা মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষায় এ বাড়তি বরাদ্দ আসলেই দরকারি। বরাবরের মতো শিক্ষা ও প্রযুক্তি পেয়েছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ- মোট প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা (মোট বাজেটের প্রায় ১৬ শতাংশ)। শিক্ষা খাতকে স্বাস্থ্যের মতোই অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। কেননা, দেড় বছর ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে রয়েছে।

পরিবহন ও যোগাযোগ খাত পেয়েছে তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ (মোট বাজেটের প্রায় ১২ শতাংশ)। এটাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ, আমাদের মেগা প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন হচ্ছে এ খাত থেকেই। যথাযথ বরাদ্দ দিয়ে এ প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে পুরো অর্থনীতি গতিশীল হবে, যার চূড়ান্ত সুফল ভোগ করবেন জনগণ। কৃষিতেও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে প্রশংসনীয় মাত্রায়। আপাতদৃষ্টিতে চলতি অর্থবছরের প্রায় ৩০ হাজার কোটি থেকে বেড়ে আসন্ন অর্থবছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি হওয়াকে বড় মনে না হলেও, কৃষিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ৬ শতাংশ। আমাদের মোট বাজেটও কিন্তু ওই ৬ শতাংশই বেড়েছে। দুর্যোগে কৃষি রক্ষাকবচ হিসেবে যেভাবে কাজ করেছে, সে বিবেচনায় বরাদ্দের এই ধারা বাজেট প্রণেতাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংবেদনশীলতা প্রমাণ করে।

২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা এখন পর্যন্ত যতটুকু বুঝেছি, তাতে কর প্রস্তাবনাগুলোকেই এর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সংবেদনশীল অংশ মনে হয়েছে। অর্থমন্ত্রী নতুন নতুন করদাতাকে করজালের আওতায় আনার যে নীতি ঘোষণা করেছেন, সেটিই কাম্য। আমরা সব সময়ই কর না বাড়িয়ে আরও বেশি করদাতাকে করজালে নিয়ে এসে রাজস্ব বাড়ানোর পক্ষপাতী। এক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানি ও কয়েকজন ব্যক্তির মালিকানাধীন কোম্পানির করহার যথাক্রমে ৭.৫ শতাংশ এবং ২.৫ শতাংশ কমিয়ে ২৫ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় এ উদ্যোগের ফলে ছোট কোম্পানিগুলো এর সুফল পাবে। নতুন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবেন। কর্মসংস্থান বাড়বে। আর ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা করজালের বাইরে ছিলেন, তারা কর দিতে উৎসাহিত হবেন। ফলে রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে তা সহায়ক হবে বলেই মনে হচ্ছে। এ ছাড়া করোনা চিকিৎসার যন্ত্রাদি আমদানিকে করমুক্ত রাখা, জুসার, ব্লেন্ডার ইত্যাদি গার্হস্থ্য ব্যবহারে বৈদ্যুতিক যন্ত্রাদির দেশীয় উৎপাদকদের সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। তবে আমার মনে হয়, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডারদের আয়ের ওপর কর বাড়ানোটা এ মুহূর্তে সঠিক হয়নি। বাড়তি করের এই চাপ সাধারণ গ্রাহক ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর পড়বে। একইভাবে আরও কিছু কর প্রস্তাব নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে। যেমন- শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চাপে পড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের ওপর কর আগের জায়গায় না রেখে কমানো উচিত, তামাক পণ্য উৎপাদনকারীদের আয়ের ওপর কর আগের জায়গায় (৪৭.৫ শতাংশ সারচার্জসহ) না রেখে ৫০ শতাংশ করা উচিত। করযোগ্য আয়ের নিম্ন সীমা বাড়ানোর বিষয়টিও ভাবা দরকার বলে মনে হয়।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোর জায়গা থেকে দেখলে আমরা একটি ভালো জায়গাতেই আছি বলতে হবে। বাজেট ঘাটতি সাম্প্রতিককালের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৬ শতাংশের সীমা অতিক্রম করলেও এটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। আমাদের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর এখন দাঁড়িয়ে আছে, তাতে এই ঝুঁকি সামাল দেওয়া কঠিন হওয়ার কথা নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশ হবে বলেছেন অর্থমন্ত্রী। আমরাও তেমনটি আশা করি। সাম্প্রতিক অতীতেও রক্ষণশীল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রক্ষেপণকে আমরা ভুল প্রমাণ করেছি। কাজেই প্রস্তাবিত বাজেটটি বাস্তবতার নিরিখে সতর্ক বাজেট হলেও যদি এর বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, তবে সংকট উত্তরণের পথে এটি সহায়কই হবে বলে মনে করি।

করোনা-দুর্যোগের মধ্যেই দ্বিতীয়বারের মতো বাজেট পেশ করা হয়েছে। ফলে আমার মনে হয়, এযাবৎকালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাজেট বাস্তবায়ন আরও দক্ষ ও কার্যকর হবে। চলতি বছরে করোনা মোকাবিলায় আমরা কিন্তু প্রধানত নির্ভর করেছি মনিটরি পলিসির ওপর। প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো খুবই সময়োপযোগী হয়েছে এবং এগুলো সুফল দিচ্ছে, এটা মানতেই হবে। তবে আসন্ন বছরে সংকট মোকাবিলার জন্য আরও বেশি মাত্রায় রাজস্ব নীতির ওপর ভর করতে হবে। আর এ কারণেই এবারের বাজেটটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। যতটুকু ধারণা করতে পারছি, আমাদের সরকারও সেদিকেই হাঁটছে। তবে যে কথাটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এখন পর্যন্ত করোনা মোকাবিলায় আমরা ভালো করলেও এ ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টিতে ভুগে ঢিমেতালে এগোনোর কোনো সুযোগ নেই। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করছি। তৃতীয় ঢেউও মোকাবিলা করতে হতে পারে। কাজেই এযাবৎকালের সাফল্য থেকে অনুপ্রাণিত হবো, কিন্তু আত্মতুষ্টিতে ভুগব না- এ নীতিতে অটল থাকা চাই।

এন এইচ, ০৪ জুন

Back to top button