জামালপুর

সুচিকিৎসা না পেয়ে মারা গেলেন সহকারী কমিশনার হীরক কুমার দাস

জামালপুর, ০১ জুন– রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়ায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সময়ক্ষেপণ ও জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সময় মতো সুচিকিৎসা না পেয়ে হাসপাতালের কেবিনশয্যায় মৃত্যুবরণ করেছেন জামালপুর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী হাকিম ও সহকারী কমিশনার হীরক কুমার দাস (৩৫)। চিকিৎসার জন্য সোমবার (৩১ মে) দুপুরে ২৫০ শয্যার জামালপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রায় ৯ ঘণ্টার মাথায় রাত ১১টার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। সোমবার রাতেই তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আলোকডিহি ইউনিয়নের গোছাহার গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে একজন সহকর্মীর অকাল মৃত্যুশোকের মুহূর্তে জেলা প্রশাসন সরাসরি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ না করলেও তারা এখন নিরবে অনুতপ্ত। কারণ দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা সময়ক্ষেপণ না করে তাকে জামালপুর থেকে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা যেত। তার মৃত্যুর পর জেলা প্রশাসক মুর্শেদা জামানসহ জেলা প্রশাসনের পদস্থ সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শোকাহত হতে দেখা গেছে। তবে জেলা প্রশাসনের সুযোগ ও সামর্থ থাকার পরও কেন তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বা ঢাকায় স্থানান্তর করে জরুরি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো না, তার মৃত্যুর পর এ বিষয়টিই এখন সামনে চলে এসেছে।

৩৭তম বিসিএস এর প্রশাসন ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা হীরক কুমার দাস ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী হাকিম হিসেবে জামালপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ট্রেজারি শাখা এবং শিক্ষা ও কল্যাণ শাখার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি সন্তান সম্ভবা স্ত্রী ও আড়াই বছর বয়সের এক ছেলে সন্তানসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।

কভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা সংক্রমণ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ তাকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। গতকাল সোমবার রাতে তার সহকর্মী সহকারী কমিশনার মো. আরিফুর রহমানও মরদেহের গাড়ির বহরে ছিলেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আলোকডিহি ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে তার মরদেহ পৌঁছায়। এ সময় পরিবারের স্বজনদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।

সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, সহকারী কমিশনার হীরক কুমার দাস গতকাল সোমবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে তীব্র জ্বর ও বমিজনিত অসুস্থতা নিয়ে জামালপুর সদর হাসপাতালে যান চিকিৎসা নিতে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিয়ে তাকে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করান। সেখান থেকে তাকে হাসপাতালের তিন তলায় নার্সদের জন্য সংরক্ষিত একটি কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। কেবিনে নেওয়ার পর তাকে স্যালাইন পুশ করাসহ প্রয়োজনীয় ওষুধও দেওয়া হয়। কিন্তু জ্বর ও বমি ছাড়াও তার আরো কোনো রোগ আছে কিনা তার জন্য প্যাথলজিক্যাল কিছু পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। কিন্তু দুপুরের পর হাসপাতালের প্যাথলজিক্যাল ল্যাব বন্ধ থাকায় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাগুলো সময় মতো করানো সম্ভব হয়নি।

একপর্যায়ে বিশেষ ব্যবস্থায় হাসপাতালের ল্যাবে ও বাইরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষা করানো হয়। সেসব পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসে রাত সাড়ে ৮টার দিকে। প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদনে তার কিডনি সমস্যা ও লিভারে ভাইরাল হ্যাপাটাইটিস শনাক্ত হয়। ইতিমধ্যে রাত ৯টার দিকে তার শারীরিক অবস্থা শঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়লে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তাকে জরুরি উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।

এ সময় হাসপাতালের কেবিনে উপস্থিত জেলা প্রশাসক মুর্শেদা জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোকলেছুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন সহকারী কমিশনার হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করছিলেন। তাকে ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নিতে নিতেই প্রায় দেড় ঘণ্টা পাড় হয়ে যায়। রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান। এ সময় জেলা প্রশাসকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও তার সহকর্মী সহকারী কমিশনাররা শোকে মুর্ছা যান। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার মরদেহ জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন। খবর পেয়ে মৃত হীরক কুমার দাসের ছোট ভাই ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক হিমু জামালপুরে এসে মরদেহ গ্রহণ করেন। জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় রাতেই অ্যাম্বুল্যান্সে করে তার মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় পাঠানো হয়।

হীরক কুমার দাসের রোগ নির্ণয়ের জন্য প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষাগুলো সময় মতো না করানো এবং তাকে ময়মনসিংহে রেফার্ড করতে সময়ক্ষেপণকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি হিসেবে দেখছেন কিনা কিংবা এসব বিষয়ে কোনো অভিযোগ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মোকলেছুর রহমান বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই আমাদের উপস্থিতিতেই চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিচ্ছিলেন। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাগুলো সময় মতো করাতে পারলে হয়তো তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিক্যালে নেওয়া যেত কিংবা সময় থাকতেই আমরা আরো অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম। হয়তো তাকে বাঁচানোও যেত। কিন্তু পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে আসে রাত সাড়ে ৮টার পর। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার অবস্থা খুবই শঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে রেফার্ড করেন। আমরা প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম। এরই মধ্যে রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান।

সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মোহা. মাহফুজুর রহমান বলেন, জ্বর ও বমিজনিত সমস্যা নিয়ে জরুরি বিভাগে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে কেবিনে ভর্তি করার পর থেকে তিনি বেশ ভালোই ছিলেন। তাকে স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। ভর্তির পর এন্টিজেন্ট কিটের মাধ্যমে তার করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নেগেটিভ ফলাফল আসে। সবার সঙ্গে তিনি কথাও বলেছেন। তাই বিকেল পর্যন্ত তাকে রেফার্ড করার মতো পরিস্থিতি হয়নি। বিকেলের পর থেকে তার অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এ সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ক্রমে রোগীর রক্ত পরীক্ষা ছাড়া ইসিজি ও এক্স-রেসহ অন্যান্য সব পরীক্ষা হাসপাতালের ল্যাবেই করানো হয়। তার রক্তের কিছু পরীক্ষা করানো হয়েছে শহরের নয়াপাড়া পাঁচরাস্তা মোড়ে বেসরকারি হযরত শাহ জামাল (রহ.) হাসপাতালে।

সমস্ত পরীক্ষার প্রতিবেদনগুলো হাতে আসার পর দেখা যায় তার কিডনি এবং লিভারে ইনফেকশন বা ভাইরাল হেপাটাইটিসে আক্রান্তসহ শারীরিক আরো কিছু সমস্যায় ভুগছেন। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ কয়েকজন সহকারী কমিশনারের উপস্থিতিতে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। তখন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা তাকে ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নিতে নিতেই রাত ১১টার দিকে তিনি মারা যান। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে জেলা প্রশাসনের কাছে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

হাসপাতালে ভর্তি রোগী সহকারী কমিশনার হীরক কুমার দাসের দ্রুত রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া শুরু না করা প্রসঙ্গে সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, উনি জ্বর ও বমি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসার পর থেকেই তাকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়। উনি যদি তখনই বলতেন যে তার আরো কিছু সমস্যা আছে। তাহলে সেভাবেই আমরা প্রস্তুতি নিতাম। বিকেলের দিকে যখন তার অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে তখনই আমরা তাকে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার আওতায় আনি। পরীক্ষাগুলোর প্রতিবেদন আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ময়মনসিংহে রেফার্ড করি। যা কিছু করা হচ্ছিল তার সবই করা হচ্ছিল জেলা প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শ করেই। এক্ষেত্রে তার চিকিৎসার জন্য আমাদের দিক থেকে সময়ক্ষেপণ বা কোনোরূপ গাফিলতি করা হয়নি।

সূত্র : কালের কণ্ঠ
এম এন / ০১ জুন

Back to top button