
আর দশজনের মতো ছোটবেলায় আমারও বাইসাইকেল চালানোর শখ ছিল। সাইকেল চালাতে গিয়ে হাঁটুতে কত হোঁচট খেয়েছি তার হিসেব নেই। এখনও সেই হোঁচটের দাগ স্মৃতিকে জাগরুক রেখেছে। তারপর অনেকদিন কেটে গেছে, আর সাইকেলে ওঠা হয়ে উঠেনি। এমনকি আর কোনোদিন সাইকেল চালাবো বলে ভাবিওনি। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিবেশ, পরিস্থিতি, আর নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার তাগিদ—আমাকে বদলে দিল। বিশ্বজুড়ে দুই চাকার যে বিপ্লব চলছে, সেই বিপ্লবের আমিও একজন গর্বিত সৈনিক হয়ে উঠলাম।
আমার পরিচিত অনেকেই এখন বাইক চালায়। বিশেষ করে যারা জিমে আসেন, তারা গাড়ি রেখে বাইক চালাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এমনকি যে পাড়ায় থাকি, সেখানে প্রায় প্রতিটি ঘরেই ৪-৫টি করে সাইকেল দেখা যায়। বিএমডব্লিউর চাইতে বাইসাইকেল তাদের কাছে বেশি গৌরবের!
বছর কয়েক আগের কথা। পাড়া-প্রতিবেশিদের দেখাদেখি অতি উৎসাহ নিয়ে কানাডিয়ান টায়ার থেকে একটি রোড বাইক কিনলাম। বাইসাইকেল কত প্রকার ও কী কী জানলাম তখনই—সিঙ্গেল গিয়ার, মাল্টি গিয়ার, রেসিং বাইক, মেসেঞ্জার বাইক, ট্যুরিং বাইক, স্পোর্টস বাইক, ফোল্ডিং বাইক—আরো কত কী!
কিন্তু সমস্যা হলো, আমার কেনা রোড বাইকটি কেবল সমতল রাস্তায় চালানোর উপযোগী। যেহেতু আমি হিল এলাকায় থাকি, শেষমেশ একটি মাউন্টেইন বাইকই কিনতে হলো। এখন বাইকে করেই আমি যাই জিম, লাইব্রেরি, শপিং সেন্টার এমনকি সাবওয়ে স্টেশন পর্যন্ত।

উইকএন্ডে বাইকে করে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে গ্যারেজ সেল দেখতে ভালোই লাগে। সবচেয়ে মজার বিষয়, নতুন ঝকঝকে ডজ ডুরাঙ্গো কিনেও যতটা নজর কাড়তে পারিনি, তার চেয়ে বেশি নজর কেড়েছে আমার সাইকেল। ডুরাঙ্গো দেখে কেউ কখনও এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেনি, “এটা কত দিয়ে কিনেছেন?”—কিন্তু বাইক নিয়ে যেখানেই যাই, তরুণ-তরুণীরা প্রশ্ন করে, প্রশংসা করে, কেউ কেউ তো কিনে নেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করে!
অনেকে মনে করতে পারেন—“নগরীর রাস্তায় আর কয়টা বাইকই বা চলে?” যারা এমনটা ভাবেন, তাদের জন্য কিছু তথ্য তুলে ধরছি।
টরন্টো নগরীতে বর্তমানে বাইসাইকেল চালকের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি। প্রতি বছর পরিবেশবাদী সংগঠন ও সিটি হেলথ ইউনিটের উদ্যোগে এই সংখ্যা বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, শহরের গড়ে ৬০% নাগরিকের অন্তত একটি করে বাইক আছে।
সাইকেল চালানো এখন কেবল বিনোদন নয়, বরং এক প্রগতিশীল ও সচেতন জীবনধারার অংশ। Bike Share Toronto-এর সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে সাইকেল রাইডের সংখ্যা ৬.৮ মিলিয়নে পৌঁছেছে—যা আগের বছরের তুলনায় ২০% বেশি। শহরে এখন ৯৫০০+ বাইক ও ৯০০-র বেশি স্টেশন রয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় এর অবদানও উল্লেখযোগ্য। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন বায়ু দূষণ হ্রাস পাচ্ছে এবং কয়েকশ’ মিলিয়ন লিটার জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে বাইক ব্যবহারের কারণে। অনেক নাগরিক গাড়ি থাকা সত্ত্বেও গ্রীষ্মকালীন পরিবেশ সচেতনতার অংশ হিসেবে বাইক চালাতে পছন্দ করেন।

ছাত্রছাত্রী, কুরিয়ার, ফুড ডেলিভারি কর্মীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ নিয়মিত বাইক ব্যবহার করে থাকেন। পুরো গ্রীষ্মকালে টরন্টো পুলিশও বাইক ব্যবহার করে টহল দিয়ে থাকে।
টিটিসির বাসে এখন বাইক রাখার ব্যবস্থা রয়েছে, আর অফ আওয়ারে সাবওয়েতেও বাইক নিয়ে যাওয়া যায়।
সবচেয়ে সুবিধাজনক বিষয় হলো—Toronto Bike Share-এর স্টেশন থেকে বাইক ভাড়া নিয়ে আপনি যেকোনো নির্ধারিত স্ট্যান্ডে গিয়ে তা রেখে দিতে পারেন। একই জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়ার দরকার নেই।
টরন্টো নগর কর্তৃপক্ষ ‘Cycling Network Plan 2025’ এর আওতায় নতুন ১০০ কিলোমিটার বাইক লেন নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ৭০ কিমি নতুন লেন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে অনেক লেন সুরক্ষিত ও আলাদাভাবে রঙিন চিহ্নিত।
এছাড়া গত দুই বছরে ইলেকট্রিক বাইকের (ই-সাইকেল) ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৪৫%। বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিক এবং দৈহিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে একটি সুবিধাজনক পরিবহন। টরন্টোর অধিকাংশ বড় বাইক দোকানে এখন ই-সাইকেল পাওয়া যাচ্ছে।
চুরি প্রতিরোধে অনেক চালক “Project 529 Garage” অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করছেন, যা ট্র্যাকিং ও বাইক উদ্ধারে সাহায্য করে।
শহরে ‘Cycle Café’ নামে রেস্তোরাঁগুলো এখন জনপ্রিয় হচ্ছে—যেখানে আপনি সাইকেল পার্ক করে কফি খেতে পারেন এবং বাইক সার্ভিসও করাতে পারেন।
ফ্যাশনপ্রেমীরা ‘Bikestyle’ নামে এক নতুন ট্রেন্ডে ঝুঁকেছেন—স্টাইলিশ, হালকা ও আরামদায়ক বাইক উপযোগী পোশাক নিয়ে।
ডাউনটাউন এলাকায় অনেক ট্রাফিক সিগন্যালেই এখন বাইক চালকদের জন্য আলাদা বাতি বসানো হয়েছে—যাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা কমে।
আরও মজার তথ্য আছে। এক জরিপে দেখা গেছে, Bike Share ব্যবহারকারীদের ১৩% জানিয়েছেন তারা বাইক চালাতে চালাতে প্রেমে পড়েছেন, কিংবা ডেটের প্রস্তাব পেয়েছেন!
বাইক চালানোর অন্যতম বড় সুবিধা হলো, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না—অর্থাৎ এটি একেবারেই দূষণমুক্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স বড় কথা নয়—সাইকেল চালালে স্বাস্থ্য উন্নত হবেই। যৌবন ধরে রাখতে চাইলে হাঁটা ও সাইকেল চালানো দারুণ কার্যকর।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কানাডার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শারীরিকভাবে অচল বা অলস জীবনযাপন করেন, যার ফলে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের কয়েক বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ হয়। শুধু সাইকেল চালনাকেই যদি জীবনযাপনের অংশ করা যায়, এই খরচ অনেকটাই কমে আসবে।
তবে সবসময় সবকিছু সুখকর নয়। প্রতি গ্রীষ্মেই টরন্টো শহরের ব্যস্ত রাস্তায় বাইক চালকের সংখ্যা বাড়ে এবং দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ে। লেন পরিবর্তন কিংবা গাড়ির দরজা হঠাৎ খোলা—এমন নানা কারণে দুর্ঘটনা ঘটে।
আমার নিজের সাথেও এমন ঘটনা হয়েছে—একবার একজন বাইক চালককে হাসপাতালে পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়েছিল। যদিও সে মাতাল ছিল, এবং শেষমেশ একটি ফুলের তোড়া তার হাতে তুলে দিয়ে যখন তার সুস্থতা কামনা করলাম, তখন বারবার বলতে লাগলো, ‘It was my fault’, ‘It was my fault’।
নগরীতে সবচেয়ে চুরি হওয়া আইটেমগুলোর মধ্যে বাইসাইকেল অন্যতম। চালকদের অনেকে তালা, হ্যান্ডেল খুলে ফেলা বা এমনকি চাকা খুলে সঙ্গে নেওয়ার মতো সতর্কতা গ্রহণ করেন। তবু রক্ষা নেই।
নগরীতে বহু বাইক দোকান আছে। একটি নতুন বাইকের দাম ২০০ ডলার থেকে শুরু করে ১২,০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। পুরনো বাইকও গ্যারেজ সেল বা ফেসবুক মার্কেটপ্লেসে খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক বিক্রেতাকে অনুরোধ করলে হোম ডেলিভারিও দেন। চুরি হয় বলে অনেকে পুরনো বাইকই বেছে নেন।
বিশ্বাস করুন আর নাই করুন; শুধু টরন্টোতেই সাইকেল চালকদের প্রায় ১৫০টি সংগঠন রয়েছে। তারা নিয়মিত সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, সেফটি প্রশিক্ষণ ও কমিউনিটি রাইড আয়োজন করে। এসব সংগঠনের মাধ্যমে গড়ে উঠছে এক ইতিবাচক, পরিবেশবান্ধব নাগরিক আন্দোলন।
সবশেষ কথা। বাইসাইকেল কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি স্বাস্থ্য, সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব জীবনের প্রতীক। নগর জীবনে এর ব্যবহার বাড়িয়ে আমরা কেবল নিজের যত্ন নিচ্ছি না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী।
আসুন, সবাই এই দুই চাকার বিপ্লবে অংশ নিয়ে আমাদের শহরকে করি আরও সুন্দর, আরও টেকসই—আর নিজের জীবনকে করি আরও সচল, প্রাণবন্ত।









