প্রবন্ধ

নজরুলচর্চায় ছায়ানট কলকাতার সোমঋতা মল্লিক

ড. মাহফুজ পারভেজ

ভারতে চলমান করোনা প্রকোপের সর্বগ্রাসী বিপদ, কলকাতার লকডাউন, মৃত্যু ও আক্রান্তের মিছিল নজরুলচর্চা থেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি ‘ছায়ানট কলকাতা’র সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পী সোমঋতা মল্লিককে। সুদূর দক্ষিণ ভারতের হায়দারবাদের উসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নবনীতা লাহিড়ীর সঙ্গে দেখা করে সংগ্রহ করেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ইংরেজি ভাষ্যের নান্দনিক আবৃত্তি।

এখানেই থেমে থাকেননি। পেন্ডামিকের বিরূপতার কারণে প্রতিবারের মতো প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করতে না পারায় বিশ্বব্যাপী নজরুল গবেষক, সঙ্গীত শিল্পীদের নিয়ে অনলাইনে আয়োজন করেছিলেন তিন দিনব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক নজরুল উৎসব’, যাতে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা নজরুলচর্চায় ব্যাপৃত ব্যক্তিবর্গ।

‘ছায়ানট কলকাতা’ প্রতিষ্ঠা করে সোমঋতা মল্লিক পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারত ও বিশ্বব্যাপী নজরুলচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। প্রতিবছর কলকাতা ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে ‘নজরুল মেলা’র পাশাপাশি ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এ পালন করেন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার। তদুপরি, নজরুলের জীবন ও কর্ম নিয়ে ডকুমেন্টারি, গবেষণা, লেখালেখির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে।

নজরুলের গান ও কবিতা নিয়ে অডিও, ভিডিও ফর্মে বেশ কিছু উল্লেখ্যযোগ্য অ্যালবামের পাশাপাশি সোমঋতা মল্লিকের নেতৃত্বে ছায়ানট কলকাতা নজরুল অনূদিত পার্শিয়ান কবি হাফিজের কাজ নিয়ে উল্লেখ্যযোগ্য গবেষণা করেছে। এ বছর নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার শতবর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণে খুঁজে বের করেছেন মধ্য কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪ সি বাড়িটি, যা বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আঁতুড়ঘর।

সোমঋতা মল্লিক বলেন, ‘১৯২১ সালে দ্বিতল এই বাড়িটিতে বসে কবি লিখেছিলেন রক্তে দোলা জাগানিয়া ‘বল বীর.. চীর উন্নত মম শির।’ কবিতার প্রতিটি পঙক্তি যেন শরীরের রক্ত শুদ্ধ করে আওয়াজ তোলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বিদ্রোহের দামামা বাজায় প্রতি মুহূর্তে, আজও এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। কোনও বিতর্ক নেই বাঙালি জীবনে এবং বৈশ্বিক পরিসরে।’

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমোচনীয় রেকর্ড সৃষ্টিকারী কবিতা ‘বিদ্রোহী’ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এসব ছাপিয়ে নজরুলচর্চায় নিবেদিত ‘ছায়ানট কলকাতা’ মহানগর কলকাতার যেসব এলাকায় নজরুল বসবাস করতেন, সেসব ঠিকানা পুনরাবিষ্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ‘ছায়ানট কলকাতা’কে নিয়ে এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সোমঋতা মল্লিক।

‘ছায়ানট কলকাতা’র সভাপতি, বিশিষ্ট শিল্পী সোমঋতা মল্লিক আলাপকালে জানিয়েছেন, ‘মালিকানার হাত বদল আর ইতিহাসের চলমানতায় নজরুল-স্মৃতিধন্য অনেক বাড়ি ও অবস্থান বিস্মৃত হয়ে গেছে। বদলে গেছে ল্যান্ডস্কেপ। তথাপি আমরা বাংলার, বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ নজরুলের কলকাতা-সংশ্লিষ্ট ইতিবৃত্ত পুনরুদ্ধার করতে আগ্রহী।’

দুঃখজনকভাবে, সুবিশাল সাহিত্যভাণ্ডার রচনা করেছেন নজরুল মাত্র ২০/২২ বছরের সংক্ষিপ্ত পরিসরেই। তারপরেই তিনি চিরনির্বাক হয়ে যান। তার সচেতন জীবনের পুরোটাই এবং অসুস্থতার দীর্ঘবছর কেটেছে কলকাতায়। ফলে নজরুল স্মৃতির কারণে কলকাতা এক সম্মানীত নগরী।

নজরুল সাম্য, মানবাধিকার, নারীমুক্তির যে শাশ্বত চেতনা তার রচনার মাধ্যমে উদ্ভাসিত করেছেন, ‘ছায়ানট কলকাতা’ সেই মর্মবাণী ধারণ করে নিজেদের কর্ম ও চিন্তায়। নজরুলের নারীজাগরণের মন্ত্র নিজ জীবনের বীজমন্ত্রে রূপান্তরিত করেছেন শিল্পী ও সংগঠক সোমঋতা মল্লিক। তিনি পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং সমগ্র পৃথিবীতে প্রসারিত বাংলাভাষী কোটি মানুষের কাছে নজরুলচর্চার অনন্য প্রতীকে।

তিন দিনব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক নজরুল উৎসবের ভিডিও দেখতে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করুন :

 

Back to top button