
প্রবাসজীবনের যে চিত্র আমাকে বারবার মুগ্ধ করে, তা হলো এখানকার ভোর। টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, নিউ ইয়র্ক—যেখানেই গিয়েছি, আমি দেখেছি কাকডাকা নয়, বরং মানুষ-ডাকা ভোর। এ শহরগুলোর মানুষ ঘুম থেকে জেগে ওঠে দায়িত্বের ডাকে। কর্তব্যের টানে।
এ যেন জীবন্ত চিত্রকল্প—আলো ফোটার আগেই মানুষ ছুটছে, যেন জীবনের ট্র্যাকসে অলিম্পিক দৌড়। কেউ বাসের পেছনে দৌড়াচ্ছে, কেউ ছুটছে ট্রেন ধরতে—চোখেমুখে এক অদম্য গতি। কি দুরন্ত সেই গতি! এ দৃশ্য প্রতিদিনের। যে সমাজের সকাল শুরু হয় দৌড় প্রতিযোগিতা দিয়ে, তার অগ্রগতি তো অনিবার্যই!
গল্প করার সময় নেই, পত্রিকা পড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না—অনেকের মতো আমারও নাস্তা খাওয়ার সময় নেই। নাস্তা চলে গাড়িতেই। এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে স্যান্ডউইচ—এটাই যেন প্রাতঃরাশের নতুন সংজ্ঞা।
রেস্টুরেন্টে বসে চা বা কফি খাওয়ার অবসর—এ যেন এক বিলাসিতা। অধিকাংশ মানুষ কফি খায় চলন্ত অবস্থায়—বাসে, ট্রেনে, গাড়িতে। গতি যেন এদের জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। তাই তো শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে ‘ড্রাইভ থ্রু’ (Drive-Thru)। গাড়ির জানালা দিয়ে হাত বাড়ালেই কফি এসে ধরা দেয় মুঠোতে। তারপর ভোঁ।
পরিচিত অনেকের সাথে কথা বলে তাদের দৈনন্দিন কর্মতালিকার একটি চিত্র বের করেছি। অনেকের কর্মস্থল বাসস্থান থেকে কয়েক শ’ কিলোমিটার দূরে। তারা ঘুম থেকে ওঠে চারটায়। তারপর সেজেগুজে বের হতে যতক্ষণ লাগে। কেউ ড্রাইভ করে আসে, কেউ আসে সাবওয়ে বা কমিউটার ট্রেনে। প্রত্যেকেরই টার্গেট থাকে পনেরো মিনিট আগে অফিসে পৌঁছানো।

টরন্টোতে জেনিফার নামে এক মহিলা কাজ করতো আমার পাশের অফিসে। আসতো নায়াগ্রা ফলসের সন্নিকটের শহর সেন্ট ক্যাথারিন থেকে। প্রায় দেড় ঘন্টার ড্রাইভ। সে ঘুম থেকে উঠে চারটায় কিংবা তারও আগে। ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক একদিনও তার অফিস লেট হয়নি। এজন্যে সহকর্মীদের কাছে তার সুনাম আছে।
কর্মজীবী মানুষ রাত নটা থেকে দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রথম প্রথম মনে করতাম এরা ঘুম কাতুরে। কেউ যখন বলতো রাতে ন’টার পর সে ফোন রিসিভ করে না; ভাবতাম নেশা করে বুঁদ হয়ে যায় এজন্যেই হয়তো ফোন ধরতে চায় না। এখন বুঝি কেন তারা এ কথা বলতো। অভিজ্ঞতার আলোকে আজ বলতে পারি যে, উত্তর আমেরিকার মানুষ কাজকে প্রাধান্য দেয়। সবকিছু একদিকে, আর বাকি কাজ অন্যদিকে। কাজের সময় কাজ, অবসরে স্ফূর্তি।
এবার আমার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের কথা একটু বলে নিই। সকালে ঘুম থেকে উঠবে বলে অনেকে মর্নিং শিফট পছন্দ না করে আফটারনুন অথবা নাইট শিফটে কাজ করে। গভীর রাত পর্যন্ত যদি টিভি দেখা আর টেলিফোনে আলাপ না-ই হলো তাহলে এ আর কেমন জীবন! তাদের ঘুম ভাঙে সকাল দশটা কিংবা এগারোটায়। এলার্ম বাজিয়েও ঘুম ভাঙানো যায় না। মুখ ধুইয়ে তারা যখন ওয়াশরুম থেকে বের হয় ততক্ষনে অফিস পাড়ায় লাঞ্চ আওয়ার শুরু হয়ে যায়।
টরন্টো ডাউনটাউনে আমার অফিসে কাজ করতেন আব্দুস সালাম নামে এক ভদ্রলোক। তিনি যেমন বাংলা জানেন তেমন ইংরেজিতেও চোস্ত। নানান বিষয়ে তার জ্ঞান দেখে আমি মুগ্ধ।
কিন্তু একটা কারণে তার প্রতি খুব বিরক্ত ছিলাম সেটা হচ্ছে তিনি সময় মতো অফিসে আসতে পারতেন না। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো দেরী হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি প্রতিদিন নিত্য নতুন গল্প তৈরি করতেন। খুবই চমকপ্রদ সেসব গল্প।
এমন গল্প তৈরি করতেন যেগুলো বিশ্বাস না করে উপায় ছিল না। যতই রাগ করি না কেন গল্প শোনার পর সব পানি হয়ে যেতো। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে প্রায় দুইবছর একসাথে কাজ করেছি কিন্তু তার বলা কোন গল্প ‘রিপিট’ হয়নি।
শুনুন তাহলে সে গল্পের কয়েকটি পর্ব:
-সালাম সাহেব আপনি তো আজ ৯টায় অফিসে আসার কথা! জানেন যে, আমার অ্যাপোয়েনমেন্ট আছে।
– হ্যাঁ জানি এবং বাসা থেকে ঠিকই রওয়ানা দিয়েছিলাম কিন্তু হঠাৎ করে সাবওয়ে আটকে গেলো। প্রায় আধঘন্টা আটকে ছিলাম। কি যে ভয়ংকর অবস্থা! কে একজন সুইসাইড করেছে।
ব্যাস, রাগ কি আর দেখানো যায়! উল্টো সে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি শোনার জন্য আগ্রহ দেখাই।
– সালাম সাহেব, আজকে আপনি লেট করলেন কিভাবে? ব্যাংকে যাবেন কখন?
– আর বলবেন না। সারারাত ঘুমুতে পারিনি। ঐ যে আমার ওপরের ফ্লাটে যে বাঙালি ফ্যামিলিটা থাকে ভেবেছিলাম খুবই ভদ্র বোধহয়। কিন্তু না, লোকটা বড্ড বদ। জানেন, সে ভদ্রমহিলার গায়ে হাত তুলেছে! শেষ পর্যন্ত পুলিশ ডাকতে হলো। ব্যাপারটা সামলাতে সামলাতে ভোর হয়ে গেছে।
রাগ কি আর রাখা যায়? উল্টো ঐ ফ্যামিলির কাহিনী শোনার জন্য তাঁকে চা বানিয়ে খাওয়াতে হয়।
-সালাম সাহেব আজ কি হলো?
– কেন খবর পাননি? আজাদ আর মজিদকে তো ইমিগ্রেশন টাস্কফোর্স ধরে নিয়ে গেছে। ওরা এখন ডিটেনশন সেন্টারে। নূরজাহানের বেশ কিছু টাকা জমা আছে আজাদের কাছে ওগুলো উদ্ধার করতে হবে।
-নূরজাহান কে?
-আরে ঐ যে, বাণিজ্যমেলায় এসে থেকে গিয়েছিলো যে মেয়েটি।
সালাম সাহেব পেরেশান! কত বড় গুরুদায়িত্ব তার! দেশ ও জাতিকে নিয়ে তিনি সব সময় চিন্তিত! শুধু চিন্তা নেই যেখানে তিনি কাজ করেন; সে অফিসের!









