
কানাডার বিস্তৃত তুষাররাজ্যে যখন সূর্য উঠে ধীরে ধীরে বরফ গলে যায়, তেমনি ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষেরা এসে এই দেশটিকে করে তুলেছে এক মানবিক মোজাইক। পাখিদের মতো দূরদিগন্ত থেকে উড়ে আসা মানুষগুলো—কেউ যুদ্ধ থেকে, কেউ দারিদ্র্য থেকে, কেউ স্বপ্নের খোঁজে—এই মাটিকে করেছে আপন। এই বহুজাতিক দেশটির বুকে এক শান্তিপূর্ণ ও সক্রিয় সম্প্রদায়ের নাম মুসলমান। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচিতি এবং সামাজিক অবদানের সম্মিলনে আজ তারা কেবল একটি সম্প্রদায় নয়—তারা কানাডার রাষ্ট্রীয় ক্যানভাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রং।
কানাডায় মুসলমানদের আগমন প্রায় দেড় শতাব্দী আগের ঘটনা। ১৮৭১ সালের আদমশুমারিতে প্রথমবারের মতো ১৩ জন মুসলমানের অস্তিত্ব সরকারি নথিতে উঠে আসে। এর অধিকাংশই এসেছিলেন ক্যানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ে নির্মাণ কাজে শ্রমিক হিসেবে। ১৯৩৮ সালে এডমন্টনে প্রতিষ্ঠিত হয় কানাডার প্রথম মসজিদ ‘আল রাশিদ’। এ ছিল উত্তর আমেরিকায় গড়ে ওঠা প্রথম মসজিদগুলোর একটি, যা এখন ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে রক্ষিত।
১৯৬০ সালের পর থেকে কানাডায় মুসলমান ইমিগ্রেন্টদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর আগে ১৯৫২ সালে মনট্রিয়লের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পাঠ্যক্রমে ইসলামিক স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত করলে অনেক মুসলমান শিক্ষার্থী কানাডায় আসে। এর দশ বছর পর টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ও একই বিষয় তাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করলে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। তারপর থেকে উত্তরোত্তর শিক্ষার্থী, দক্ষ শ্রমিক এবং ব্যবসায়ীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২০২৩ সালের অনুমান অনুযায়ী, কানাডার মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়ন (২০ লাখ) ছাড়িয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৫%-এর বেশি। মুসলিম সম্প্রদায় কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী। সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত শহর: টরন্টো (৪৫০,০০০+), মন্ট্রিয়ল (২৫০,০০০+), ক্যালগারি (১০০,০০০+), এডমন্টন ও ভ্যানকুভার। ২০২১ সালের কানাডা আদমশুমারি অনুযায়ী, কানাডায় মুসলমানদের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ (1.8 million), যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৯%। এই হার ২০০১ সালে ছিল মাত্র ২%। ২০৩০ সালের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা ৩ মিলিয়ন ছাড়াতে পারে (Pew Research)।
মুসলমানদের মধ্যে প্রায় ৬৭% অভিবাসী, যাঁদের বড় অংশ এসেছেন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, সিরিয়া, সোমালিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া, লেবানন, মিসর ও নাইজেরিয়া থেকে।

কানাডার মুসলমানরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে অত্যন্ত মনোযোগী। ধর্মীয় রীতিনীতি তারা পালন করেন ব্যক্তি, পারিবারিক এবং সামাজিক পরিসরে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় মুসলমানদের প্রার্থনালয়ে যাতায়াতের হার সবচেয়ে বেশি। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় অনেক মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ থাকে।
বর্তমানে কানাডাজুড়ে রয়েছে ১০০০-এর বেশি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। শুধু টরন্টোতেই রয়েছে প্রায় ২০০টির মতো মসজিদ, যেগুলোর মধ্যে কিছু সুউচ্চ মিনার ও দৃষ্টিনন্দন গম্বুজসহ নির্মিত।
আল রাশিদ মসজিদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন অব টরন্টো, মারখাম মুসলিম সেন্টার, মন্ট্রিয়ল ইসলামিক সোসাইটি, এবং মিসিসাগা ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার, মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র।
বাংলাদেশিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালনায় কয়েকটি মসজিদ রয়েছে এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- টরন্টোর বায়তুল মোকাররম, বায়তুল আমান ও আবেদিন মসজিদ।
স্ট্যাটিষ্টিক কানাডার এর তথ্যমতে, মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ প্রবল। মুসলমানদের মধ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারীর হার ২৭%, যেখানে জাতীয় গড় প্রায় ১৭%।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মুসলমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে উল্লেখযোগ্য অংশ। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, ম্যাকগিল, ওয়াটারলু, ইয়র্ক, এবং কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম ছাত্র সংগঠনগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি চোখে পড়ে।

এছাড়া কানাডার বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠেছে ইসলামিক স্কুল, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়।
কানাডার বহু মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে সপ্তাহান্তে শিশুদের জন্য ‘উইকেন্ড ইসলামিক স্কুল’ পরিচালিত হয়, যেখানে কুরআন শিক্ষা, ইসলামি ইতিহাস ও নৈতিকতা শেখানো হয়। পরিবারগুলো চেষ্টা করে যাতে সন্তানরা একইসঙ্গে আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী হয়।
কানাডার অর্থনীতিতে মুসলমানদের অবদান এখন আর নিছক ক্ষুদ্র ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ প্রযুক্তি, ব্যাংকিং, রিয়েল এস্টেট, ওষুধ শিল্প, নির্মাণ এবং কৃষি ব্যবসায় মুসলমানদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। মুসলিম-মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব তৈরি করে। হালাল ফুড ইন্ডাস্ট্রি কানাডায় বছরে ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে (২০২৩)। মুসলিম উদ্যোক্তারা বিশেষভাবে সক্রিয় টেক সেক্টরে (বিশেষ করে ওয়াটারলু/টরন্টোতে)।
কানাডা তার সংবিধানের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতার যে পথ সুগম করেছে, সেখানে মুসলমানরা শুধু ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে টিকে থাকেনি—তারা সমাজ গড়ায় অংশ নিয়েছে, কানাডার স্বপ্নে তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে।
২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে ১৫ জন মুসলিম এমপি কানাডার পার্লামেন্টে তাদের স্থান করে নেন, যা সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রতিফলিত করে। এর আগে ২০১৫ সালে আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণকারী ম্যারিয়াম মন্সেফ কানাডার ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মন্ত্রী হিসেবে নারী ও লিঙ্গ সমতা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ওমর আলগাবরা (পরিবহন মন্ত্রী) এবং আহমেদ হুসেন (সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রী) এর মতো প্রভাবশালী মুসলিম নেতারা উচ্চপদে থেকে নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। এছাড়া, সংসদ সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরে মুসলিম নেতৃবৃন্দ তাদের দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।

গত এক দশকে কানাডার প্রাদেশিক রাজনীতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অগ্রগতি জাতীয় পর্যায়ের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং বিস্তৃত, যা কানাডার রাজনৈতিক বহুত্ববাদের চিত্রকে আরও বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলেছে।
মুসলিম নেতৃত্বের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এখন প্রায় প্রতিটি প্রদেশেই দৃশ্যমান। অন্টারিও প্রদেশে, ২০১৮ সালে স্কারবোরো-সাউথওয়েস্ট থেকে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন ডলি বেগম। তিনি ছিলেন প্রথম বাংলাদেশি-কানাডিয়ান নারী এমপিপি, নির্বাচিত হন নিউ ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (NDP) থেকে। একই সময়ে জাহিদ আব্বাসি প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ (PC) দলের হয়ে পরিবহন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ২০১৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত। বর্তমানে অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদে ৭ জন মুসলিম এমপিপি সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কুইবেক প্রদেশে ২০২২ সালের নির্বাচনে ৫ জন মুসলিম এমএনএ নির্বাচিত হন, যা প্রদেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
আলবার্টা প্রদেশে, ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির (UCP) হয়ে মুহাম্মদ ফাইয়াজ ২০২২ সালে শ্রম মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। ক্যালগারি ও এডমন্টনের মুসলিম প্রাদেশিক প্রতিনিধিদের সংখ্যা বর্তমানে ৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় রানা সুলতানা ২০২৩ সালে BC NDP থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন।
২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কানাডার প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম সদস্য সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই নারী প্রতিনিধি, যা শুধু সংখ্যাতেই নয়, গুণগতভাবেও মুসলিম নারীদের নেতৃত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতি নির্দেশ করে। এই প্রবণতা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অভিবাসন সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটাতে সাহায্য করছে।

এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বাস্তব ফলাফলও দেখা যাচ্ছে। অন্টারিওতে ইসলামিক হলিডেগুলোকে সরকারি স্বীকৃতি প্রদান (২০২৩), আলবার্টায় হালাল ফুড নিয়ন্ত্রণ আইন পাস (২০২২), এবং কুইবেকে ধর্মীয় প্রতীক পরিধানের অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত আইনি ও নীতিগত অগ্রগতি—সবই এই সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণেরই ফলশ্রুতি।
প্রাদেশিক রাজনীতিতে এই ক্রমবর্ধমান প্রতিনিধিত্ব মুসলিম কানাডিয়ানদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে, যেখানে এখন আর তারা কেবল ভোটার নন, বরং সিদ্ধান্ত প্রণেতা। স্থানীয় ও প্রাদেশিক পর্যায়ের এই সাফল্য জাতীয় রাজনীতিতে তাদের ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করছে।
স্থানীয় রাজনীতিতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নাহিদ নেনশি, একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম নেতা, ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্যালগারি শহরের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কানাডার একটি প্রধান মহানগরের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তার নেতৃত্বে ক্যালগারি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম অর্জন করে। বর্তমানে মেয়র, কাউন্সিলর এবং স্কুল বোর্ড ট্রাস্টি পদে মুসলিম নেতাদের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কানাডার বহুসংস্কৃতিবাদী সমাজে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ বহন করে।
আজ মুসলমানরা শিক্ষায়, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে, সংস্কৃতিতে কানাডার অগ্রগতির অংশীদার। তাদের মসজিদে শুধু প্রার্থনা হয় না—সেখানে চলে ফুড ব্যাংক, আশ্রয় সহায়তা, যুব প্রশিক্ষণ, নারীর ক্ষমতায়ন, আন্তঃধর্ম সংলাপ ও মানবতা চর্চা। এসব কর্মসূচিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ বিস্ময়কর। Toronto Muslim Response Network, National Zakat Foundation, Islamic Relief Canada—এসব সংস্থা শুধু মুসলমানদের নয়, অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদেরও পাশে দাঁড়ায় দুর্যোগ বা সংকটকালে।
মুসলমানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। পবিত্র কুরআন শিক্ষা দেয়: “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমার ধর্ম আমার জন্য।” এই নীতিকে তারা ধারণ করে আন্তঃধর্ম সংলাপে অংশ নেয় এবং সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখে।
কানাডা যেমন একটি ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী রাষ্ট্র, মুসলমানরাও তেমনি একটি বহুমাত্রিক, বিবেকবান ও গতিশীল জনগোষ্ঠী। মুসলমানদের অবদান কেবল পরিসংখ্যানের খাতা পূরণ করে না, তা কানাডার হৃদয়ে, রাস্তায়, শ্রেণিকক্ষে, সংসদ ভবনে ও মানবিক উদ্যোগে দৃশ্যমান। তারা প্রমাণ করেছে—একজন ভালো মুসলমান হওয়া মানে একজন ভালো কানাডিয়ান হওয়া।









