কক্সবাজার

প্রথমবারের মতো ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের খুশির ঈদ

আবদুর রহমান

কক্সবাজার, ১৪ মে– ভাসানচরে এবার প্রথমবারের মতো ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা। গত ডিসেম্বরে রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে ভাসানচর স্থানান্তর শুরু হওয়ার পর এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছান।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ভাসানচরস্থল নৌবাহিনীর আয়োজনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ওয়ার হাউজে প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে তিন ভাগে ঈদের জামাত ভাগ করা হয়। শারীরিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ চরে শরণার্থী শিশু-কিশোররা সেজেগুজে, নতুন জামা-কাপড় পরে আনন্দে মেতে উঠেছে। ধর্মীয় এই উৎসব উপলক্ষে তাদের জন্য বিনোদন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার হয়েছে।

এ বিষয়ে ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিচালক ও নৌবাহিনীর কমোডর রাশেদ সাত্তার বলেন, ভাসানচরে এবার প্রথমবারের মতো আনন্দের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করছেন রোহিঙ্গারা। মহামারির কারণে এখানে ঈদের জামাত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ভাসানচরের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি গুচ্ছগ্রামের ‘ফোকাল’ (সমন্বয়ক) রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মোহাম্মদ সোহেল জানান, আনন্দ নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছে রোহিঙ্গারা। সকাল থেকে সবাই নতুন জামা পরে বড় প্যান্ডেলে অনুষ্ঠিত ঈদের জামাতে অংশ নেয় হাজারো মানুষ। ঈদের নামাজ আদায়ের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমাম ও মুসল্লিরা। মোনাজাতে অংশ নেওয়া মুসলিমরা আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দোয়া কামনা করেন। পাশপাশি নিজ দেশ মিয়ানমারে মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

ভাসানচর থানার ওসি মোহাম্মদ মাহে আলম বলেন, সকাল সাড়ে ৭টায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভাসানচরে প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরা হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দে মেতে উঠেছে। তাছাড়া তাদের আনন্দের জন্য খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে সকাল ৮টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উৎসবে শিশুরা সকাল থেকেই সেজেগুজে, নতুন জামা-কাপড় পরে ক্যাম্পে আনন্দে মেতে উঠেছে। রোহিঙ্গারা অনেকে নতুন জামা, গেঞ্জি, লুঙ্গি, মাথায় টুপি ও চশমা পরে শিবিরে বেড়াচ্ছে। এবারে শিবিরে নাগরদোলা, চড়কিসহ মেলা না বসলেও কিছু ক্যাম্পে গলিতে খেলা বসিয়ে সেখানে ভিড় করছে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোররা।

টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, এবার ঈদের সকাল থেকে সেজেগুজে, নতুন জামা-কাপড় পরে ক্যাম্পের শিশু-কিশোররা। তবে অন্যবারের মত সেখানে কোনো ধরনের খেলার আয়োজন করতে দেওয়া হয়নি। ইতোমধ্যে তার ক্যাম্পে করোনা রোগী পাওয়ায় তারা খুব ভয়ে আছে। সরকারি যেসব নিদের্শনা সেটি সবাইকে পালন করতে মসজিদে মাইকিং করে বলা হয়েছে। বড়রা নিদের্শনা মানলেও শিশু-কিশোররা ঈদের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে করোনা মুক্তির দোয়া করা হয়েছে। পাশপাশি নিজ ভূমিতে অধিকার নিয়ে ফিরে যেতে পারবো সেই প্রার্থনাও করা হয়েছে ঈদের জামাতে। তবু যতটুকু সম্ভব ক্যাম্পে করোনা রোধে সচেতন করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত ২০১৭ সালে ২৫ আগস্ট কোরবানি ঈদের মাত্র কয়েকদিন আগে রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী সংগঠন আরসা রাখাইনের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলা চালায়। প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু করে। এর ফলে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পুরনোসহ উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ওই বছরের নভেম্বর মাসে কক্সবাজার থেকে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে একটি প্রকল্প নেয় সরকার। আশ্রয়ণ-৩ নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে। এর অংশ হিসেবে গত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় প্রায় ১৯ হাজার রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছান।

এম এন / ১৪ মে

Back to top button