মুক্তমঞ্চ

পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয়: বাংলাদেশের কী লাভ!

আনিস আলমগীর

পশ্চিমবঙ্গে টানা তিনবারের মতো তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হওয়ার পর দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বুধবার, ৫ মে ২০২১। অভূতপূর্ব ফলাফল করেছে তৃণমূল, যেখানে মমতা আবার ক্ষমতায় আসতে পারবেন কিনা সন্দেহ ছিল অনেকের। সবক’টি এক্সিট পোল ভুয়া প্রমাণিত করে ২১৩ আসন নিয়ে তৃণমূল জয়ী হয়েছে। বিজেপির সাবেক সভাপতি অমিত শাহ ২০০ আসনে জেতার ফাঁকা আওয়াজ দিলেও ৭৭ আসন পেয়েছে তারা। মমতা নিজের আসনে পরাজিত হলেও শাসনতন্ত্র অনুযায়ী ৬ মাসের মধ্যে আরেকটি আসনে সহজে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রিত্ব চালিয়ে যেতে পারবেন।

মমতা বিজয়ী হওয়াতে তাকে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন- দিদি বিজয়ী হওয়ায় এবার কি বাংলাদেশ তিস্তার জল পাবে, নাকি এবারও অভিনন্দন জলে যাবে? স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, পশ্চিমবঙ্গে দিদি জয়ী হলে বাংলাদেশের কী লাভ! আমি ওই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সংক্ষেপে বলতে চাই মমতার জয়ের মূল কারণ কী কী। প্রথমে বলি প্রশান্ত কিশোর এবং তার আইপ্যাক কোম্পানির কথা। প্রশান্ত কিশোর ১৯৭৭ সালে জন্ম নেওয়া এক ভোট কারিগর। মাঝখানে রাজনীতিতেও নাম লিখিয়েছিলেন বিহারের নীতিশ কুমারের জনতা দলে (ইউনাইটেড) যোগ দিয়ে। কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (২০১৯)-এর প্রতি নীতিশ কুমারের সমর্থনের সমালোচনা করায় তাকে ২০২০ সালে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

এই প্রশান্ত কিশোর এবং তার কোম্পানি এবার মমতাকে জেতানোর কাজ নিয়েছিলেন। তাদের সেবা নিয়ে তামিলনাড়ুতে এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে-ও বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছে। সবচেয়ে মজার বিষয়, পুরো মিডিয়া যখন উল্টো কথা বলছিল তখন প্রশান্ত চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন ১০০-এর নিচে না হলে তিনি এই প্রফেশন ছেড়ে দিবেন। অবশ্য জেতার পরও এনডিটিভির সঙ্গে একান্ত আলাপে প্রশান্ত বলেছেন তিনি ব্যক্তিগতভাবে আর এই কাজ করবেন না। তবে আইপ্যাক থাকবে এবং সেখানে তার দায়িত্ব পালন করার মতো দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন বিজয়ের পরও তিনি নির্বাচন কমিশনের ওপর গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

তার অভিযোগ, কমিশন বিজেপিকে জেতানোর জন্য হেন কোনও কাজ নেই করেনি। বিজেপি যা বলেছে নির্বাচন কমিশন তাই করার ফ্রি হ্যান্ড দিয়েছে। করোনা মহামারির মধ্যে নির্বাচনকে ৮ পর্বে করেছে যাতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা দফায় দফায় পশ্চিমবঙ্গে আসতে পারেন। যেসব জেলায় বিজেপির অবস্থান ভালো সেসব এলাকার নির্বাচন শুরুতে এবং একযোগে করেছে আর তৃণমূলের ঘাঁটিগুলোতে নির্বাচনের ক্ষেত্রে এক জেলায় ৪/৫ পর্বে নির্বাচন করেছে যাতে তৃণমূল কর্মীদের প্রাণচাঞ্চল্য একযোগে চোখে না পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ৩০ শতাংশ ভোট এবার পুরোটাই তৃণমূল পেয়েছে, সে কারণে বাম এবং কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে এমন তত্ত্বও আছে। বাস্তবে মাইনরিটি ভোট পুরোটাই তৃণমূল তো পেয়েছেই, ৭০ শতাংশ হিন্দু ভোটারদের যারাই বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের সমর্থক ছিল তারাও বিজেপি ঠেকাও প্রশ্নে ‘ভোট নষ্ট’ না করে তৃণমূল প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। ‘হিন্দুরা বিপদে, ৭০ শতাংশ ভোটার তোমরা কেন একজোট হয়ে হিন্দুদের উদ্ধার করছো না’- বিজেপির এই পুরনো ভাঁওতাবাজি এখানে খাটেনি। কারণ, দেখা যাচ্ছে যেসব এলাকায় মুসলমানের সংখ্যা ৫ শতাংশ সেখানেও বিপুল ভোটে তৃণমূল জিতেছে। ভোট হয়েছে বিজেপি বনাম সব দল। সে কারণে অন্য সব দলের অস্তিত্ব নেই ফলাফলে। ভোট হয়েছে মমতা বনাম মোদি নয়, মমতা বনাম শূন্যতা। কারণ, মমতার বিকল্প রাজ্যে কোনও লিডার ছিল না বিজেপির, যাকে মমতার উচ্চতায় সামনে আনতে পারে।

আসলে প্রশান্ত কিশোরের টিম এই নির্বাচনকে বাঙালি বনাম বহিরাগত রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। বাঙালির যত গৌরবময় অনুষ্ঠান, রবীন্দ্রনাথ-বিদ্যাসাগর-নেতাজি-সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে যত কৃতী বাঙালি রয়েছে, গত প্রায় দুই বছর ধরে তাদের জীবিত করার চেষ্টা করেছে। হিন্দুত্ববাদী স্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’-এর বিপরীতে ‘জয় সীতারাম’ প্রতিষ্ঠিত করেছে। নির্বাচনকালে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান এনেছে। বিজেপি যখন যোগী আদিত্যনাথদের ডেকে মুসলমানদের ভিটেমাটি, দেশছাড়া করার হুমকি দিয়েছে, প্রশান্ত কিশোরের টিম মমতাকে মুসলমানদের একমাত্র রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে। আবার শুভেন্দু অধিকারী নামের মমতার ডান হাত বিজেপিতে গিয়ে তাকে ‘বেগম মমতা’ বলে কটাক্ষ করলে মমতাকে কালীর পূজারিও বানিয়েছে। মমতা হিন্দুত্ব ত্যাগ করেননি প্রমাণ দিতেন, জনসভায় নানা মন্ত্র পড়েছেন।

বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে যতটাই হিন্দুত্ববাদের জোয়ার আনতে চেয়েছে, হিন্দিভাষী বক্তা এনে জনসভা করেছে, রথযাত্রা করেছে, গেরুয়া রঙে ঢেকে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গকে- সবই তাদের বিরুদ্ধেই কাজে লাগিয়েছে আইপ্যাক। মমতার প্রতি সংহতি জানাতে এসেছেন বাংলার সঙ্গে সম্পর্কিত নেতা ও ব্যক্তিত্বরা, যেমন জয়া ভাদুড়ী বচ্চন। আর বিজেপির জন্য এসেছেন স্মৃতি ইরানীর মতো হিন্দি সিরিয়ালের এককালের নায়িকা, বর্তমানের বিজেপি নেতা। বিজেপি প্রেসিডেন্ট জগৎ প্রকাশ নাড্ডা, অমিত শাহ, যোগী আদিত্যনাথ তো পড়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী পদের কোনও লোক এর আগে একরাজ্যে এত জনসভা করেনি, নরেন্দ্র মোদি এবার যা করেছেন পশ্চিমবঙ্গে।

সব মিলিয়ে মমতার ভোট পরিকল্পকরা এসবকে বাঙালি বনাম বহিরাগত, বাঙালির সংস্কৃতি ধ্বংসকারী উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন হিসেবে দেখিয়েছে। এমনকি নরেন্দ্র মোদির ‘দিদি..ওওওও দিদিইই’ ব্যঙ্গাত্মক বাক্যকে যৌন হয়রানির হিসেবে তুলে ধরেছে। উদাহরণ এসেছে যোগীর ইউপির নারী নির্যাতন চিত্র। পশ্চিমবঙ্গের নারীদের একজোট করা হয়েছে এবং এরাই ছিল মমতার প্রধান সমর্থক গোষ্ঠী। তার সরকার নারী, শিশু, কিশোরের জন্য অনেক ভালো কাজ করেছে- তারও প্রতিদান দিয়েছে মহিলারা। সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে এটা বাংলার মানুষের মমতার প্রতি ভালোবাসা নয়, মোদি এবং তার বিজেপির রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ।

অন্যদিকে, একের পর এক নেতারা তৃণমূল ছেড়ে গেছেন। সবাই তাতে তৃণমূল দুর্বল হবে ভেবেছিলেন কিন্তু তাদের দল ত্যাগের আসল কারণ প্রশান্ত কুমারের টিম, যেখানে একান্তভাবে সহায়তা করেছে মমতার ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জি। এই টিমের রিপোর্টের ভিত্তিতে যারা জিততে পারবেন না তাদের তালিকা করা হয়েছিল। নমিনেশন পাবেন না এই পূর্বাভাস জেনেই তারা বিজেপিতে ভিড়েছে। আর বিজেপি আগে থেকে যারা ত্যাগী নেতা তাদের বাদ দিয়ে তৃণমূল থেকে আসা ‘বিরাট নেতাদের’ প্রার্থী করেছেন। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে বিজেপি প্রার্থীদের মধ্যে এরাই সিংহভাগ হেরেছে।

যাই হোক, তিস্তার পানি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই তা জেনেও এবার নির্বাচনে মমতা জেতায় বাংলাদেশের কি লাভ সে কথা বলি। তার আগে দেখেন পশ্চিমবাংলা এত প্রয়োজন হয়ে গিয়েছিল কেন বিজেপির জন্য। শুধু কি মমতাকে হারানো। না, কারণ বাংলাদেশকে বিজেপির নেতারা কখনও মনেপ্রাণে মেনে নেয়নি। ভারতের পাশে তারা বাংলাদেশকে ‘আরেকটি পাকিস্তান’ মনে করেন। কারণ, ধর্মের বাইরে সুস্থভাবে কোনও কিছু বিবেচনা করার বোধশক্তি এদের নেই। তাই বাংলাদেশকে বিপন্ন এবং পদে পদে বিপর্যস্ত করতে হলে পশ্চিমবাংলায় তাদের নিজস্ব সরকার দরকার ছিল।

অমিত শাহের কথা আর কী বলবো। সবাই জানেন এই নির্বোধ লোকটি বাংলাদেশিদের কতটা হেয় করে কথা বলেন। পশ্চিমবাংলা বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, রাজ্যটিতে ‘অবৈধভাবে’ বাস করা এক কোটি বাংলাদেশি মুসলিমকে ফেরত পাঠানো হবে। দিলীপ ঘোষ দাবি করেছেন পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী এক কোটি অবৈধ মুসলিম সরকারের দুই রুপির ভর্তুকির চাল খেয়ে বেঁচে আছে, আমরা তাদের ফেরত পাঠাবো বলে মন্তব্য করেছেন। দিলীপ ঘোষ পশ্চিমবাংলার আড়াই কোটি মুসলমানের ১ কোটিকে বাংলাদেশি বানিয়ে ফেরত পাঠানোর খায়েশ প্রকাশ করতেন। কারণ, দিলীপ ভালো জানেন মুসলমান ভোট বিজেপির পক্ষে যাবে না। তিনি এটাও জানেন, পশ্চিম বাংলায় কোনও বাংলাদেশি মুসলমান নেই, থাকলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে যাওয়া হিন্দুরা রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক আছে। নানা প্রতিকূলতা আছে সত্য, কিন্তু তারা উল্লেখযোগ্য কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় ঘৃণা, বৈষম্যের শিকার নয়। স্বাধীনভাবে তারা ধর্ম পালন করে। এসব তথ্য পশ্চিবঙ্গে যায় না। বরং বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলিকে ঢালাওভাবে প্রচার করা হয় গুরুত্ব দিয়ে। বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে পশ্চিমা দেশে প্রবাসী বাঙালি হিন্দুদের একটা বড় অংশ এ ধরনের নেগেটিভ ক্যাম্পেইনে জড়িত আছেন। এরা মোদির দলকে বিপুল পরিমাণে ডোনেশনও করে, যাদের ইচ্ছা পশ্চিমবঙ্গ হবে বাঙালি হিন্দুদের তীর্থভূমি। মমতা বিজয়ী হওয়ায় সে পথ রুদ্ধ হয়েছে। বেঁচে গেছে দুই বাংলা। কারণ, ওপারে নিরীহ মুসলমানদের যোগী আদিত্যনাথের অনুসারীরা নির্যাতন করলে এই পারের ধর্মান্ধরাও হিন্দুদের প্রতি নির্যাতন চালাতো। কিংবা এই পারে হিন্দুদের ওপর কোনও নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া পড়তো ওই পারের মুসলমানদের ওপর। অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৯৪৬-এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার আগে থেকেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন রয়েছে সম্প্রীতির বন্ধন, তেমনি ঘৃণাও একেবারে কম না।

আপাতত সেই মুসিবত থেকে রক্ষা পেলো দুই বাংলা।

এন এইচ, ০৫ মে

Back to top button