পরিবেশ

সব জেলায় হবে পরিবেশ আদালত, সব বিভাগে আপিল আদালত

মাসুদ রানা

ঢাকা, ২৪ মার্চ – বেগবান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং শিল্পায়নের মধ্যে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। তাই সব জেলায় পরিবেশ আদালত এবং সব বিভাগে পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আগামী সপ্তাহের মধ্যে আইন, সংসদ ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে বলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন সারাদেশে মাত্র তিনটি পরিবেশ আদালত ও একটি পরিবেশ আপিল আদালত রয়েছে। পরিবেশ দূষণ রোধ ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে অন্যান্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থায় বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে, জেল-জরিমানার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান বলেন, ‘সব জেলায় পরিবেশ আদালত হলে পরিবেশ সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স বাড়বে। পরিবেশ দূষণ কমবে। আমরা তো পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের মন্ত্রণালয় হিসেবে সব জেলায় পরিবেশ আদালত চাইব। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোরও সহযোগিতা দরকার। এ বিষয়ে কাজ চলছে।’

পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পরিবেশ আদালত রয়েছে। এছাড়া ঢাকায় একটি পরিবেশ আপিল আদালত রয়েছে। অবস্থানগত বিষয়সহ বিভিন্ন কারণে এসব আদালতে মামলার সংখ্যা কম। পরিবেশ আদালতগুলোতে দেড় হাজারের মতো মামলা আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন : ঢাকার সবচেয়ে বেশি ও কম দূষিত এলাকা চিহ্নিত

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ অনুবিভাগ) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখন পরিবেশ দূষণ প্রতিকারে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া যায়। এছাড়া পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারাও এনফোর্সমেন্টে যেতে পারেন, তারা ক্ষতিপূরণের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারেন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে এক্ষেত্রে একটি আপিল কর্তৃপক্ষও আছেন। একইসঙ্গে পরিবেশ আদালতের মাধ্যমেও দূষণের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘পরিবেশ আদালত ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের নানা সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু আমাদের পরিবেশ আদালতও মাত্র তিনটি। অন্যদিকে এখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাপক হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন পরিবেশসম্মত উন্নয়ন। এ বিষয়টি অ্যাড্রেস করতে গেলেও তো আমাদের এনফোর্সমেন্টে যেতে হবে। এসব বিবেচনায় সব জেলায় পরিবেশ আদালত ও বিভাগে পরিবেশ আপিল আদালত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ‘আদালত করার মূল পদক্ষেপটি নেবে আইন মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রস্তাব প্রস্তুতের জন্য আমরা গত ১০ মার্চ একটি সভা করেছি। আশা করছি, আমাদের যুক্তিসহ প্রস্তাব আগামী সপ্তাহের মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারব।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান এ বিষয়ে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটা ভালো উদ্যোগ। আমরা এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। অনুমোদনের পর আদালতগুলো যাতে চালু হয় সে পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে, একই সঙ্গে পরিবেশ আদালত যাতে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি দু’বছর ঘুরেও নিম্ন আদালতে শব্দদূষণের বিষয়ে মামলা করতে পারিনি। পরে যখন সব বাধা উপেক্ষা করে মামলা করতে পেরেছি, তখন নিম্ন আদালত বললেন এটা এখানকার বিষয় নয়, উচ্চ আদালতে যান। এ বিষয়গুলোতে নজর দিতে হবে। এখন যে পরিবেশ আদালত আছে, সেখানেও তো সেভাবে মামলা নেই। শুধু আদালত করলেই হবে না, সেগুলো কার্যকর রাখতে হবে।’

এখন পরিবেশ নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও সচেতনতা বেড়েছে মন্তব্য করে আবু নাসের বলেন, ‘সরকারি দফতরগুলোও আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়। পরিবেশ দূষণ রোধে সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজনের তুলনায় কম।’

পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (আইন) খোন্দকার মো. ফজলুর হক বলেন, ‘সব জেলায় পরিবেশ আদালত এবং সব বিভাগে পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠা নিয়ে গত ১০ মার্চ একটি মিটিং হয়েছে। একটি প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে, সেটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এটার সঙ্গে কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই। এখন জেলায় যে কোর্টগুলো আছে ওই কোর্টের একটি অংশকে দায়িত্ব দেবে যারা মামলাগুলো নেবে। আশা করছি, এটা হবে। এতে বাড়তি কোনো খরচ হবে না এবং জনবলও নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন হবে না। এখন যে জেলায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা আছেন তাদের একটি অংশকে পরিবেশের মামলাগুলো দেখার দায়িত্ব দিলেই হবে।’

‘বাংলাদেশে বর্তমানে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে পরিবেশ আদালত আছে। এছাড়া ঢাকায় আছে একটি পরিবেশ আপিল আদালত। ৬৪টি জেলায়ই পরিবেশ আদালত এবং আটটি বিভাগে পরিবেশ আপিল আদালত করার প্রস্তাব দিচ্ছি।’

পরিচালক আরও বলেন, ‘পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এ বলা হয়েছে, যারা দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা ক্ষতিপূরণ চেয়ে পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারবে। এছাড়া মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। এখন তো আপনার অবস্থান যেখানেই হোক ক্ষতিগ্রস্ত হলে আপনাকে ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটে গিয়ে মামলা করতে হবে। যাতায়াতের ঝামেলার কারণে কেউ মামলা করতে চায় না।’

‘একসময় দেশ ছিল কৃষিনির্ভর, এখন দ্রুত শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে। শিল্পায়ন যত বেশি হবে দূষণও তত বেশি হবে। সেই দূষণ প্রতিরোধ করতে গেলে আমাদের পরিবেশ আদালত লাগবে। আর যাই হোক মানুষ কিন্তু আদালত ও শাস্তিকে ভয় পায়। এক বছরের জেল হলে সেটাও অনেক প্রভাবে ফেলে।’

তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় উল্লেখ করে আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাব। আশা করি, এটা হয়ে যাবে।’

বর্তমানে পরিবেশ আদালতে দেড় হাজারের মতো মামলা আছে জানিয়ে ফজলুর হক বলেন, ‘সারাদেশে আদালত থাকলে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হতো। দূরের জেলার কোনো মামলা ঢাকায় হলো- এক্ষেত্রে সাক্ষীকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে সময় লেগে যায়। কাছাকাছি না থাকায় পরিবেশ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিযোগ জানাতেও অনীহা রয়েছে।’

ফজলুর হক আরও বলেন, ‘সরকারের উচ্চ মহল থেকেই চাইছে টেকসই উন্নয়ন। উন্নয়ন হবে কিন্তু সেটা হতে হবে পরিবেশ রক্ষা করে। আমাদের বিচারকরাও এ বিষয়ে সচেতন। নদীদূষণের বিষয়টি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে হাইকোর্ট থেকে রায়ও দেয়া হয়েছে।’

পরিবেশ আদালত আইনের ৭ (৪) ধারা অনুযায়ী পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শকের লিখিত প্রতিবেদন ছাড়া কোনো পরিবেশ আদালত পরিবেশ আইনের অধীন কোনো ক্ষতিপূরণের দাবি বিচারের জন্য গ্রহণ করবেন না। শর্ত থাকে যে, কোনো আবেদনের ভিত্তিতে পরিবেশ আদালত যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক কোনো ক্ষতিপূরণের দাবি গ্রহণের অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করেননি এবং এ অভিযোগ বা দাবি বিচারের জন্য গ্রহণের যৌক্তিকতা আছে। তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিদর্শক বা মহাপরিচালককে শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দিয়ে লিখিত প্রতিবেদন ছাড়াই সরাসরি ক্ষতিপূরণের দাবি বিচারের জন্য গ্রহণ করতে বা যথাযথ মনে করলে দাবি সম্পর্কে তদন্তের জন্য আদালত নির্দেশ দিতে পারবেন।

এ ধারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সরাসরি মামলা করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেন পরিবেশবাদীরা। এ বিষয়ে পরিচালক বলেন, ‘যৌক্তিক হলে তো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি মামলা করতে পারছে, তার আবেদনও বিবেচনায় নেয়া হবে। তবে প্রক্রিয়া মেনে এটা হবে।’

গত দুই বছরে (২০১৯ ও ২০২০ সাল) ৩৭৭টি পরিবেশ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে জানিয়ে পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক বলেন, ‘এর মধ্যে ৩৭৬টি মামলায় সরকারের পক্ষে রায় হয়েছে। একটি মামলা বিপক্ষে গেছে, আমরা সেটার লিভ টু আপিল করেছি। অন্য মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয় সেজন্য তৎপর আছি।’

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ২৪ মার্চ


Back to top button
🌐 Read in Your Language