জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তারেক রহমানের পাঁচ দফা প্রস্তাব

ঢাকা, ২৪ সেপ্টেম্বর- মানবিক সহায়তা দেওয়ার উদারতা কখনোই রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশই বহন করবে, এমনটা আশা করা যায় না।
এই সংকট সমাধের নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্যানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেছেন তিনি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে এই ইভেন্টের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে রোহিঙ্গাদের সফলভাবে প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
বাংলাদেশের ওপর এই বিশাল বোঝার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বড় ধরনের মানবিক দায়িত্ব পালন করছে। ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। মানবিকতার কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছিল এবং তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন বসবাসের জন্য শিবিরগুলো কোনো আদর্শ জায়গা নয়।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতির কারণে শুধু রোহিঙ্গারাই নয়, কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়েছে। অথচ প্রয়োজন বাড়লেও মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের জন্য সহায়তার আবেদন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে আনা হয়েছে। এই প্রবণতা চলতে পারে না।
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সংকটের শুরু মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই। দুঃখজনকভাবে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো গভীর উদ্বেগের। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
সংকট সমাধানে শুধু প্রতিশ্রুতি না দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি জরুরি প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রথমত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারের বেসামরিক মানুষ ও রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। নিজ ভূমিতে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা পায়।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করতে হবে।
চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)সহ আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দিতে হবে এবং গুরুতর অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
পঞ্চমত, এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা মাদক, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে নিজের দায়িত্ব পালন করেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি গল্প হয়ে না থাকে; বরং তা যেন ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার গল্প হয়ে ওঠে এবং সেই গল্পের শুরু এখনই করতে হবে।
এস এম/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬







