সম্পাদকের পাতা

মানিব্যাগে হাত না দিয়েও টাকা চুরি করছে আধুনিক পকেটমার

নজরুল মিন্টো

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে অপরাধের ধরনও পাল্টেছে। একসময় ভিড়ের মধ্যে নিপুণ হাতে মানিব্যাগ সরিয়ে নেওয়াকে পকেটমারের চরম দক্ষতা মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানের ডিজিটাল যুগে চোরেরা আর কারো পকেটে হাত দেয় না; তারা পকেট ‘স্ক্যান’ করে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বড় শহরগুলো থেকে শুরু করে জনাকীর্ণ বিমানবন্দরগুলোতে এখন এই ‘ডিজিটাল পকেটমার’ বা আরএফআইডি (RFID) স্কিমিংয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই নতুন ধরনের অপরাধের ভয়াবহতা এখানেই যে, ভুক্তভোগী অনেক সময় বুঝতেই পারেন না ঠিক কখন, কোথায় এবং কীভাবে তার আর্থিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ল।

আধুনিক ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড এবং পাসপোর্ট এর অনেকগুলোতেই Radio Frequency Identification (RFID) চিপ ব্যবহৃত হয়। এই সুবিধার কারণেই মানুষ দ্রুত ট্যাপ করে পেমেন্ট করতে পারেন। তবে এখানেই ঝুঁকির দরজাও খুলে যায়। অপরাধীরা পোর্টেবল রিডার বা স্ক্যানার ব্যবহার করে কার্ডের সিগন্যাল ধরার চেষ্টা করে। কয়েক ফুট দূর থেকেই এসব ডিভাইস তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। মানিব্যাগ আপনার পকেটেই থাকবে, অথচ আপনার অজান্তে কার্ডের তথ্য পাচার হয়ে যেতে পারে।

লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর। সেখানকার এক ক্যাফেতে কফির জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক পর্যটক। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ফোনে একের পর এক ট্রানজ্যাকশনের অ্যালার্ট মেসেজ আসতে শুরু করে। পরে CCTV ফুটেজে দেখা যায়, একটি সাধারণ ব্রিফকেস হাতে এক ব্যক্তি তার খুব কাছ দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। সন্দেহ করা হয়, সেই ব্রিফকেসের ভেতরেই ছিল লুকানো শক্তিশালী স্ক্যানার।

নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি ব্যস্ত শপিং মলে এক সপ্তাহে প্রায় ডজনখানেক মানুষের কার্ড অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। তদন্তকারীরা ধারণা করেন, অপরাধীরা ‘ক্রাউড স্কিমিং’ (Crowd Skimming) পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা খাওয়ার ছলে অপরাধী তার স্মার্টফোনে থাকা বিশেষ অ্যাপ বা ছোট স্ক্যানার ব্যবহার করে ভুক্তভোগীর পকেটের কাছে নিয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের এই সংযোগেই কার্ডের সংবেদনশীল তথ্য চুরি হয়ে যায়।

প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বা লুভর মিউজিয়ামের মতো জায়গায় পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। ইউরোপীয় পুলিশের (Europol) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেখানে কিছু সংঘবদ্ধ চক্র এখন আর মানিব্যাগ ছিনতাই করে না। তারা ‘কন্টাক্টলেস পেমেন্ট’ সুবিধার অপব্যবহার করে ছোট ছোট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, যা অনেক সময় ভুক্তভোগী খেয়ালও করেন না।

ই-পাসপোর্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। আধুনিক ই-পাসপোর্টে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা (built in security feature) থাকলেও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সময় পাসপোর্ট খোলা অবস্থায় অযথা প্রদর্শন না করা এবং প্রয়োজনে সুরক্ষামূলক কভার (protective cover) ব্যবহার করা বাড়তি নিরাপত্তা দিতে পারে।

ভিড়ের মধ্যে কেউ অস্বাভাবিকভাবে খুব কাছে আসার চেষ্টা করলে বা ব্যাগ/পকেটের কাছে কোনো ডিভাইস ধরার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিক সতর্ক হতে হবে। আর যদি বুঝতে পারেন আপনার কার্ডের তথ্য চুরি হয়েছে বা কোনো অননুমোদিত ট্রানজ্যাকশন হয়েছে, তবে দ্রুত ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে কার্ডটি ব্লক বা ফ্রিজ করে দিন।

ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং কন্টাক্টলেস পেমেন্টের সীমা যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা ভালো। প্রতিটি লেনদেনের জন্য ইনস্ট্যান্ট মেসেজ, অ্যাপ অ্যালার্ট বা পুশ নোটিফিকেশন চালু থাকলে টের পেতে দেরি হয় না। অনেক ব্যাংক সাময়িকভাবে কার্ড স্থগিত রাখা বা ভ্রমণকালীন বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা দিয়ে থাকে, যা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর এই ঝুঁকি থেকে বাঁচার প্রথম শর্ত হলো প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা। বর্তমানে বাজারে এমন মানিব্যাগ বা কার্ড হোল্ডার পাওয়া যায় যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল ব্লক করে দেয়। এটি ব্যবহারের ফলে কোনো স্ক্যানার কার্ডের তথ্য পড়তে পারবে না।

ডিজিটাল যুগে পকেটমাররা আর ছেঁড়া জামা বা নোংরা হাতে ঘুরে বেড়ায় না; তারা এখন স্যুট-টাই পরা পরিপাটি প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত ডিভাইসের মাধ্যমে তারা আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যের দখল নিতে চায়। মনে রাখতে হবে, আধুনিক বিশ্বে আপনার পকেট নয়, আপনার ‘তথ্য’ সুরক্ষিত রাখাই আসল নিরাপত্তা।

তথ্যসূত্র:
Europol, Fraud against payment systems
Interpol, Payment card fraud
Consumer Financial Protection Bureau, Regulation E


Back to top button
🌐 Read in Your Language