ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য রক্ষায় তুরস্কের গুরুত্ব বাড়ছে

তেহরান, ৭ এপ্রিল – ইরান এবং ইসরায়েলের চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তুরস্ককে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইরানের সম্ভাব্য দুর্বলতা বা সেখানে কোনো বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় দেখা দিলে পুরো অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষার মূল দায়িত্ব আঙ্কারার ওপরই বর্তাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক তাহা ওজহান একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে ইরান কোনোভাবে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হলে তা মধ্যপ্রাচ্যকে শান্ত করার পরিবর্তে আরও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার দিকে ধাবিত করবে।
এই রাজনৈতিক শূন্যতা শুধু ইসরায়েলের ভৌগোলিক আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ তৈরি করবে না বরং ইরাক ও সিরিয়ায় অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে নতুন করে শরণার্থী সংকট এবং আন্তঃসীমান্ত সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। তুরস্ক ও ইরানের ইতিহাস এবং ভূরাজনীতি কয়েক শতাব্দী ধরে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে অপরিবর্তিত সীমান্ত নিয়ে টিকে থাকা এই দুই দেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের ধারায় যথেষ্ট মিল রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিদেশি দখলদারিত্ব থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সামরিক অভ্যুত্থান এবং আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে দেশ দুটির অভিজ্ঞতায় সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
তবে আশির দশকে ইরান যখন একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল তখন তুরস্ক ন্যাটোর অংশ হয়ে পশ্চিমা নিরাপত্তা বলয়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুরস্ককে ইরানের প্রতি এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেছে যা সৌদি আরব বা পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে শক্তির শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল তা ইরানকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু বর্তমানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি চাপের মুখে ইরানের সেই প্রতিরক্ষা কৌশল হুমকির মুখে পড়েছে। তুরস্ক মনে করে ইরানের পতন বা চরম দুর্বলতা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
বরং এর ফলে ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্ত নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং সন্ত্রাসবাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি ফিলিস্তিন থেকে শুরু করে লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্ক এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
তবে আঙ্কারার কৌশল শুধু আধিপত্য বিস্তার নয় বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকেই নিবদ্ধ হওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের আস্থার সংকট এবং ইসরায়েলের একক প্রাধান্য নিয়ে আঙ্কারার অস্বস্তি আগামী দিনে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন মোড় আনতে পারে। বিশেষ করে কাতার এবং সৌদি আরবের সাথে তুরস্কের সমীকরণ এই ভারসাম্য রক্ষায় বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে।
এস এম/ ৭ এপ্রিল ২০২৬









