সম্পাদকের পাতা

টরন্টোতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি তরুণ ওয়ামিকের মৃত্যু

নজরুল মিন্টো

টরন্টোর সেই বিকেলটি শুরু হয়েছিল আর দশটি দিনের মতোই স্বাভাবিকভাবে। ড্যানফোর্থ অ্যাভিনিউর ব্যস্ত সড়কে মানুষের চলাচল, গাড়ির গতি, নগরজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ সবই ছিল আগের মতো। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই হঠাৎ নেমে আসে এক নির্মম অভিঘাত। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে থেমে যায় এক তরুণ প্রাণের যাত্রা, আর গভীর শোকে ভেঙে পড়ে একটি পরিবার। কানাডার টরন্টোতে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ২১ বছর বয়সী যুবক ওয়ামিক (Wamiq) নিহত হওয়ার ঘটনায় এখন শোকাচ্ছন্ন স্বজনেরা, ব্যথিত পরিচিতজনেরা, আর স্তব্ধ হয়ে আছে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটিও।

গত রবিবার, ৫ এপ্রিল, বিকেলে নগরীর ড্যানফোর্থ অ্যাভিনিউর বাংলা টাউনের সন্নিকটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের সূত্রে জানা গেছে, নিহত ওয়ামিক ছিলেন বাবা মামুন ও মা শান্তার একমাত্র সন্তান।

টরন্টো পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, রবিবার বিকেল ৩টা ৫ মিনিটের দিকে ওয়ামিক তার কাওয়াসাকি নিনজা (Kawasaki Ninja) মোটরসাইকেল চালিয়ে ড্যানফোর্থ অ্যাভিনিউ দিয়ে পশ্চিমমুখী যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক, অর্থাৎ পূর্ব দিক থেকে আসা একটি টয়োটা হাইল্যান্ডার (Toyota Highlander) এসইউভি সড়কের পাশের একটি প্লাজায় প্রবেশের জন্য বাম দিকে মোড় নেওয়ার চেষ্টা করে। সেই মুহূর্তেই মোটরসাইকেলটির সঙ্গে এসইউভিটির সংঘর্ষ হয়।

সংঘর্ষের আঘাতে ওয়ামিক মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এরপর তিনি রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখা একটি গাড়িতে সজোরে আছড়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, পুরো ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত আকস্মিক ও ভয়াবহ। দুর্ঘটনার পরপরই জরুরি সেবাকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করেন। টরন্টো প্যারামেডিকস আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওয়ামিককে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দুর্ঘটনার পর টরন্টো পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে এবং তদন্ত শুরু করে। পুলিশ জানিয়েছে, টয়োটা হাইল্যান্ডারের চালক ঘটনাস্থলেই অবস্থান করছিলেন এবং তদন্তকারীদের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছেন।

টরন্টো পুলিশের ইন্সপেক্টর এরল ওয়াটসন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না যে অতিরিক্ত গতি, চালকের ভুল সিদ্ধান্ত, নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতিগত কারণ এ দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সেদিনের আবহাওয়া দুর্ঘটনায় কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তকারীরা ইতোমধ্যে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি যারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছেন বা যাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ রয়েছে, তাদের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তদন্তের স্বার্থে দুর্ঘটনার পর ড্যানফোর্থ অ্যাভিনিউয়ের বিং অ্যাভিনিউ (Byng Avenue) থেকে রবিনসন অ্যাভিনিউ (Robinson Avenue) পর্যন্ত অংশটি কয়েক ঘণ্টার জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং টিটিসি (TTC)-র ১১৩ ড্যানফোর্থ ও ২০ ক্লিফসাইড রুটের বাসগুলোকে বিকল্প পথে চলাচল করতে হয়। ব্যস্ত নগরীর একটি বিকেল এভাবেই এক দুর্ঘটনার অভিঘাতে থমকে দাঁড়ায়।

ওয়ামিকের এই মৃত্যু শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির নাম। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার পরিবার এখন গভীর শোকে বিপর্যস্ত। টরন্টোর বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও এ ঘটনায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তদন্তে হয়তো দুর্ঘটনার কারণ স্পষ্ট হবে, কিন্তু এই অকাল মৃত্যু যে শূন্যতা রেখে গেল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

তথ্যসূত্র:
CBC News (৬ এপ্রিল ২০২৬)
CTV News (৬ এপ্রিল ২০২৬)
The Canadian Press (৬ এপ্রিল ২০২৬)
CP24 (৬ এপ্রিল ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language