
গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে জন্ম নেয় না, বরং জন্ম নেয় সেই রাষ্ট্রচিন্তায়, যেখানে নাগরিকের সুবিধা, মর্যাদা এবং অধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত অনিশ্চয়তা, অসুস্থতা, মাতৃত্ব, দূরযাত্রা, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক দায় অনেক সময় মানুষকে নির্দিষ্ট ভোটের দিনে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়। কিন্তু গণতন্ত্র যদি সত্যিই সবার হয়, তবে ভোটদানের পথও হতে হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। এই প্রয়োজন থেকেই বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পেয়েছে অগ্রিম ভোটদান বা অ্যাডভান্স ভোটিং। এটি শুধু একটি বিকল্প ব্যবস্থা নয়, বরং এমন এক স্বীকৃতি, যা বলে, নাগরিকের ভোটাধিকার কোনো ক্যালেন্ডারের একক দিনের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।

আগামী ১৩ এপ্রিল ২০২৬ কানাডার তিনটি ফেডারেল উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, অন্টারিওর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট, অন্টারিওর ইউনিভার্সিটি রোজডেল এবং কুইবেকের তেরবোন আসনে। ইলেকশনস কানাডা জানিয়েছে, এই তিন আসনেই ৩ এপ্রিল থেকে অগ্রিম ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভোটাররা নিজ নিজ কেন্দ্রে ভোট দিতে পারবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় ইলেকশনস কানাডা অফিসে বিশেষ ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে ৭ এপ্রিল সন্ধ্যা পর্যন্ত।
অগ্রিম ভোটদান ব্যবস্থার ইতিহাস যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কানাডায় বিশেষ ব্যালট ও আগাম ভোটের ধারণা প্রথমে চালু হয়েছিল তাদের জন্য, যারা নির্বাচনের দিন নিজ এলাকায় উপস্থিত থাকতে পারতেন না। পরবর্তীতে আইনি সংস্কারের মধ্য দিয়ে এই সুযোগ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। ইলেকশনস কানাডার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের সংস্কারের পর বিশেষ কারণ দেখানো ছাড়াই অধিকাংশ ভোটারের জন্য আগাম ভোটের পথ খুলে যায়। ২০১৪ সালে আগাম ভোটের দিন বাড়ানো হয়, পরে ভোটঘণ্টাও বাড়ানো হয়। ফলে অগ্রিম ভোটদান এখন কানাডার নির্বাচনী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের আরও অনেক দেশে একই ধারা দেখা যায়। ফিনল্যান্ডে সাধারণভাবে নির্বাচনের ১১ দিন আগে থেকেই অগ্রিম ভোট গ্রহণ শুরু হয়। নরওয়েতেও নির্বাচনপূর্ব দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাররা আগাম ভোট দিতে পারেন। এসব উদাহরণ দেখায়, অগ্রিম ভোটদান এখন আর ব্যতিক্রমী কোনো ব্যবস্থা নয়, বরং আধুনিক গণতান্ত্রিক চর্চার একটি স্বীকৃত ও কার্যকর অংশ।
অগ্রিম ভোটের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। একজন গর্ভবতী নারী, সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মা, অসুস্থ বা প্রবীণ নাগরিক, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী, কর্মসূত্রে অন্য শহরে থাকা মানুষ, ভ্রমণে থাকা পেশাজীবী কিংবা জরুরি বিদেশযাত্রায় ব্যস্ত কোনো ভোটার, সবার জন্যই এটি এক বাস্তবসম্মত সমাধান। এর পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ সুফল রয়েছে। ভোটারদের চাপ কয়েক দিনে ভাগ হয়ে যায়, মূল ভোটের দিনে দীর্ঘ লাইন কমে, এবং নির্বাচনকর্মীরা আরও সুশৃঙ্খল পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আধুনিক প্রশাসনিক ভাষায় একে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কার্যকর পদ্ধতিও বলা যায়।
বাংলাদেশে অগ্রিম ভোটদান চালু এবং প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদানের দাবি বেশ পুরোনো। নব্বই দশক থেকে আমি এ বিষয়ে নানা পরিসরে যুক্তিগুলো তুলে ধরে আসছি। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের জন্মহার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের জনসংখ্যার হিসাব একত্রে ধরলে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৬০০ শিশুর জন্ম হয়। অর্থাৎ একটি নির্বাচনের দিনকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না। শুধু যেদিন সন্তান জন্ম নেয় সেদিনই নয়, তার আগে ও পরে কয়েক দিনও অনেকের পক্ষে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া বাস্তবে সম্ভব হয় না। সেই সঙ্গে নবজাতকের দেখভালে ব্যস্ত দাদী, নানী, পরিবারের অন্য নারী সদস্য বা গৃহকর্মীরাও ভোট দিতে যেতে পারেন না। ফলে একেকটি নির্বাচনে লাখ লাখ ভোটার কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেক বাস্তবতা। ব্যবসায়িক কারণে অন্য শহরে অবস্থান করা মানুষ, জরুরি প্রয়োজনে দেশের বাইরে যাওয়া নাগরিক, হাসপাতালের পূর্বনির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকা রোগী, দীর্ঘ দূরত্বের শ্রমজীবী মানুষ, এমনকি নির্বাচনের দিন নিজ এলাকা থেকে দূরে থাকা অসংখ্য ভোটারও কার্যত ভোটাধিকারের বাইরে থেকে যান। ফলে অগ্রিম ভোটদানের প্রশ্নটি কেবল একটি প্রশাসনিক সুবিধার বিষয় নয়, বরং একটি বাস্তব গণতান্ত্রিক প্রয়োজনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বাস্তবতাগুলো সামনে রেখে আমি ধারাবাহিকভাবে লেখালেখি করেছি, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সরাসরি দেনদরবার করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছি, প্রেস কনফারেন্স করেছি, মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছি এবং দেশের মানুষ ও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। এসব উদ্যোগ কোনো ব্যক্তিগত অভিমত থেকে নয়, বরং একটি বিস্তৃত গণতান্ত্রিক প্রয়োজনকে সামনে রেখে নাগরিক দাবির অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রবাসী প্রতিনিধি, দেশের শীর্ষ আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত থেকে এ দাবির যৌক্তিকতা ও গুরুত্বকে আরও জোরালো করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহে বিষয়টি প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি।

তবে আশার জায়গা তৈরি হয়েছে প্রবাসী ভোটাধিকার নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্যোগে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন ডায়াসপোরা ভোটিং নিয়ে আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু করেছে, এবং সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের পথও কিছুটা খুলেছে। এই পরিবর্তন সম্ভব হওয়ায় আশা করা যায়, অগ্রিম ভোট চালুর পথও একদিন বাস্তবায়িত হবে।
বাংলাদেশ চাইলে শুরুতেই সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা না এনে ধাপে ধাপে এগোতে পারে। গর্ভবতী নারী, সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মা, প্রবীণ নাগরিক, গুরুতর অসুস্থ রোগী, হাসপাতালনির্ভর ভোটার, কর্মসূত্রে অন্য জেলায় থাকা মানুষ এবং জরুরি বিদেশযাত্রীদের জন্য সীমিত পরিসরে পাইলট প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। পরে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, ভোটার শনাক্তকরণ, কেন্দ্রীয় ডেটাবেইস ও পোস্টাল ভোটের সক্ষমতা বাড়িয়ে তা আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব। দরকার কেবল সদিচ্ছা, নীতি-নির্ভর পরিকল্পনা এবং ভোটারকে কেন্দ্র করে ভাবার রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
পরিশেষে বলা যায়, অগ্রিম ভোটদান কোনো বিলাসিতা নয়। এটি এমন এক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা রাষ্ট্রকে আরও মানবিক করে এবং নাগরিককে আরও সম্পৃক্ত করে। ভোটারকে সুযোগ দিলে তিনি ভোট দেন, আর সেই সুযোগ সীমিত হলে গণতন্ত্রও সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই অংশগ্রহণমূলক, আধুনিক ও জনবান্ধব গণতন্ত্র গড়ে তুলতে চায়, তবে অগ্রিম ভোটদান নিয়ে এখনই গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। কারণ একটি ভোট হারানো মানে কেবল একটি সংখ্যা হারানো নয়, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে একজন নাগরিকের সম্পর্কের সূক্ষ্ম সেতুটি দুর্বল হয়ে যাওয়া।
তথ্যসূত্র:
Elections Canada (১ এপ্রিল ২০২৬)
CityNews (৩ এপ্রিল ২০২৬)
Deshe Bideshe (৭ জুলাই ২০০৫)









