জাতীয়

নতুন সরকার গঠনেই সচিবালয়ে তদবিরের হিড়িক, বিব্রত মন্ত্রীরা

ঢাকা, ৪ এপ্রিল – নতুন সরকার গঠনের পর প্রশাসনে নানামুখী তদবির শুরু হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শুধু তদবির আর আবদার নিয়ে আসছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাস পূর্ণ না হতেই সচিবালয়ে নেতা কর্মী ও সাধারণ মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

তিনি জানান যে প্রয়োজনীয় কাজগুলো অবশ্যই করা হবে, তবে শুধু তদবিরকে প্রধান গুরুত্ব দিলে সমস্যা সৃষ্টি হবে। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরে দর্শনার্থীদের ভিড় বহুগুণ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না বললেই চলে, এখন সেখানে রাজনৈতিক সরকারের আমলে মানুষের যাতায়াত বেড়েছে ব্যাপক হারে। নেতা কর্মীদের কথা শুনতে গেলে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের নানা রকম আবদার শুনতে হচ্ছে।

এলাকার উন্নয়ন কাজ, কৃষি, খাদ্য, বাণিজ্যসহ নানা খাতের ব্যবসা, ঠিকাদারি, নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়া, সারের ডিলার নিয়োগ এবং বিভিন্ন পদে পদায়নের তদবির নিয়ে আসছেন অনেকে। নিজের ছেলেমেয়ের চাকরির ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধা যাচাইবাছাই পুনরায় খতিয়ে দেখা, ভাতার ব্যবস্থা করা, পুলিশের ওসি ও এসআই রদবদল, নিজ এলাকায় এসিল্যান্ড রদবদল এবং জলমহাল ইজারা পাইয়ে দেওয়ার আবদার নিয়ে হাজির হচ্ছেন অনেকে। অবসরে চলে গেছেন এমন কর্মকর্তাদের চুক্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতেও একটি গোষ্ঠী কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় করছেন।

রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে চিকিৎসকদের সুবিধাজনক স্থানে বদলির তদবির চলছে জোরেশোরে। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ বা স্বাচিপ সমর্থিত চিকিৎসকদের সরিয়ে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ড্যাব এর চিকিৎসকদের গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাও রাজধানীমুখী ভালো কলেজগুলোতে পদায়নের জন্য ঘুরছেন। অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সাবেক কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং ওএসডি থাকা কর্মকর্তাদের পদায়নের জন্য চাপ বাড়ছে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় কবলিত এলাকার সংসদ সদস্যরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের জন্য ডিও লেটার দিচ্ছেন।

তদবিরের চাপে অনেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী অনেকটা বিরক্ত ও বিব্রত হলেও তারা প্রকাশ্যে ধৈর্য ধারণ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অনেকেই নেতা কর্মীদের আশ্বস্ত করছেন যে আইনানুগ ও ন্যায্য বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী জানান, তারা যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে চান। তবে প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে অনেক ক্ষেত্রেই যোগ্যতার বদলে তদবিরের ভিত্তিতে পদায়ন হচ্ছে।

বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও পদায়নের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সচিবালয়ে প্রবেশ পাস সীমিত থাকলেও নানা উপায়ে মানুষ ভেতরে ঢুকে দিনভর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তদবির করে বেড়াচ্ছেন। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর মিথ্যা মামলার শিকার হওয়া দলীয় নেতা কর্মীরা এখন সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ও সহায়তা প্রত্যাশা করছেন।

এ কারণেই ভিড় বাড়ছে এবং তারা মন্ত্রীদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশায় লম্বা সময় ধরে স্মৃতিচারণা করছেন। সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া মন্তব্য করেছেন যে রাজনৈতিক সরকারে মানুষের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। তবে সব ধরনের অযৌক্তিক তদবির নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজন। তদবিরের নামে কেউ যেন অবৈধ সুযোগ সুবিধা না পায় সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর হতে হবে।

এস এম/ ৪ এপ্রিল ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language