জ্বালানির কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারি: পরিস্থিতি সামাল দিতে আসছে ‘ফুয়েল কার্ড’

ঢাকা, ৩ এপ্রিল – ইরান ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এর সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশেও গত এক মাস ধরে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পেট্রল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং চরম ভোগান্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ সরবরাহ ঘাটতি নয় বরং অসাধু ব্যবসায়ী ও কিছু ব্যক্তির অবৈধ মজুদ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করা। বাজারে তেলের সরবরাহ থাকলেও সুষ্ঠু বিতরণের অভাবে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কালোবাজারি।
অনেক স্থানে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায় ভোর থেকে রাত পর্যন্ত মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেক চালক তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন। বেশিরভাগ পাম্পে ঝুলছে তেল নেই লেখা সাইনবোর্ড। যেখানে তেল পাওয়া যাচ্ছে সেখানে মানুষের অসহনীয় ভিড় তৈরি হচ্ছে। চালকদের অভিযোগ সরকারের আশ্বাসের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। অনেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন যা সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার কারণে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এমন আশঙ্কায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তেল মজুদ করতে শুরু করেছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি এবং গ্যারেজের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেও জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এতে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা ও জেলসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে এসব পদক্ষেপেও অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই সংকট মোকাবেলায় কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল বৃহস্পতিবার জানান সংকট বা আতঙ্কের সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিছু পাম্প থেকে অতিরিক্ত তেল বাইরে বিক্রির অভিযোগ যেমন রয়েছে তেমনি ব্যক্তিগতভাবে জ্বালানি তেল মজুদ করে বেশি দামে বিক্রির প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এই অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ফুয়েল কার্ড চালুর সরকারি উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন প্রতিটি গাড়ির জন্য দৈনিক বা নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ নির্ধারণ করা গেলে অপব্যবহার অনেকটাই কমে আসবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান অবৈধ মজুদদারদের কারণে পাম্পগুলোতে বাড়তি সরবরাহ দিয়েও চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। গত বছরের তুলনায় এ বছর মার্চের শুরুতে দ্বিগুণ তেল সরবরাহ করা হলেও আতঙ্কিত ক্রেতা ও মজুদদারদের কারণে তা সামাল দেওয়া যায়নি। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে মানুষের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য কেনার প্রবণতা বা প্যানিক বায়িং বন্ধ না হওয়ায় সরবরাহ চেইনে মাঝে মাঝে বিঘ্ন ঘটছে। অবৈধ মজুদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস ডিস্ট্রিবিউটরস এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল জানান গুজব এবং তেল ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে চার হাজার ৮২৪টি অভিযান চালিয়ে তিন লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটার অবৈধ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব অভিযানে দুই হাজার ৯টি মামলা দায়ের করা হয় এবং এক কোটি টাকার বেশি জরিমানা আদায় করা হয়। পাশাপাশি ২৪ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে দুই লাখ ৫৫ হাজার ১৮ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে। দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলমান অস্থিরতা মোকাবেলায় সরকার সব ধরনের যানবাহনের জন্য ফুয়েল কার্ড চালুর পরিকল্পনা করেছে। এই কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ধারণ ও ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যে এই কার্ড সেবার জন্য একটি অ্যাপ চালু করা হবে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটি জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট এবং এর সরবরাহ ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের নেতারা এক বিবৃতিতে জানান সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকরা পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছেন না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় অস্থিরতা ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিলেট ও মৌলভীবাজারে পেট্রল পাম্প মালিকরা ধর্মঘটের ডাক দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিরাজগঞ্জ পটুয়াখালী ফরিদপুর এবং নোয়াখালীতে অবৈধ তেল মজুদ ও পাচার রোধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় জ্বালানি তেল চুরিবিরোধী এক সাঁড়াশি অভিযানে যৌথ বাহিনী ৩৭ হাজার লিটার অবৈধ ডিজেল জব্দ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সদর ঘাটসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে একটি ট্যাংকার জাহাজে অভিযান চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ তেল উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান জ্বালানি তেল চুরির সিন্ডিকেট বন্ধে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
এস এম/ ৩ এপ্রিল ২০২৬









