অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে বহুমুখী সংকট: কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সরকারের বাজেট ভাবনা

ঢাকা, ৩ এপ্রিল – দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ মৌলিক খাতগুলোতে নানামুখী সংকট ও অব্যবস্থাপনার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। নতুন বাজেট প্রণয়নের প্রাক্কালে অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা সংশ্লিষ্টদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে টিকা না পেয়ে শিশুদের মৃত্যু এবং হামের আকস্মিক প্রাদুর্ভাব স্বাস্থ্য খাতের অবিশ্বাস্য দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতেও দেখা যাচ্ছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায় নতুন অর্থবছর কড়া নাড়ছে, যার জন্য জাতীয় বাজেট প্রণয়ন অপরিহার্য।
তবে বৈশ্বিক কারণে জ্বালানি খাতে চাপ বৃদ্ধি, চড়া মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি অর্থনীতিকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখে ফেলেছে। পূর্ববর্তী ঋণের চাপের সঙ্গে বর্তমান জ্বালানি সংকট যুক্ত হয়ে নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। সরকার ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির সূচনা করার প্রত্যাশা করলেও বাস্তব পরিস্থিতি বেশ কঠিন। ব্যবসা বাণিজ্যসহ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে কর ও জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর ভাবনা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বারবার জানানো হয়েছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক ধাক্কা এরই মধ্যে দেশের বাজার, শিল্প ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে দেশের অর্থনীতি চাপে পড়েছে। জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা ও খাদ্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি ব্যবসায়ীদের নতুন করে দুর্ভাবনায় ফেলেছে। আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি পুরো ব্যবস্থার মূল্যকাঠামো নির্ধারণের মৌলিক উপাদান। পরিবহন খাতে জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজার ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একসময় বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই বিশ্বে সাফল্যের রোল মডেল হলেও বর্তমানে তার চিত্র হতাশাজনক। ২০২২ সালে টিকার আওতা ৯৭.৯ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালের জুনে তা ৮৫.৮ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে তা মাত্র ৫৭.১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অতীতে অপারেশন প্ল্যান বন্ধ করে দেওয়া এবং সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা কেনার সিদ্ধান্তে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়। ফলে সময়মতো টিকা দেশে পৌঁছায়নি।
এর পরিণতিতে হামের প্রাদুর্ভাবে ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে বড় ধরনের দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইউএসএআইডির তহবিল বন্ধ হওয়া এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। এই বহুমুখী সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষা খাতেও। হাম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অতীতে করোনার সময় একটানা ৫৪৪ দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই থমকে আছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের মননশীলতা ও গবেষণার চেয়ে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কঠিন বাস্তবতার মাঝে সব বাধা অতিক্রম করে একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি ও জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়নই এখন নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এস এম/ ৩ এপ্রিল ২০২৬









