ইরান যুদ্ধের জেরে বাংলাদেশে চরম জ্বালানি সংকটের শঙ্কা

ঢাকা, ২ এপ্রিল – যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর প্রভাবে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ জ্বালানিশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট।
বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে দিনরাত দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন হাজারো মানুষ। প্রতিদিন বাইশ কিলোমিটার যাতায়াত করা মাজিদ আলী তাদেরই একজন। মোটরসাইকেলের জ্বালানি পেতে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত দ্রুত তলানিতে নেমে যাচ্ছে। অনেক ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে গেট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরবরাহ যন্ত্রগুলো প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে রাখা তীব্র সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
মাজিদ আলী জানান, অকটেন ছাড়া তার চলাচলের কোনো উপায় নেই এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর জ্বালানি না পেয়ে অনেককেই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। রাজধানীর বাইরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে প্লাস্টিকের বোতলে করে চড়া দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগর ও ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এশিয়ার প্রায় নব্বই শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথেই পরিবাহিত হয়। সতেরো কোটি পঞ্চাশ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের কারণে সরকার কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরুতে দেশে ডিজেলের মজুত ছিল মাত্র এক লাখ পনেরো হাজার চারশ তেয়াত্তর টন, যা দিয়ে বড়জোর নয় দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অন্যদিকে অকটেনের মজুত দিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ চলা যাবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এপ্রিল মাসে ভারত থেকে চল্লিশ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে জ্বালানি ও গ্যাস আমদানির জন্য আড়াইশো কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক সহায়তা খুঁজছে বাংলাদেশ।
সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি রেশনিং, বিক্রিতে বিধিনিষেধ এবং বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে থাকা মজুত দিয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের চাহিদা পূরণ সম্ভব।
সংকট কাটাতে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া ও অ্যাঙ্গোলা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্থায়ী ছাড় চেয়েছে বাংলাদেশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, স্পট বাজার থেকে চড়া দামে কেনাকাটায় রিজার্ভ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পেট্রোবাংলা আড়াই গুণ বেশি দামে স্পট বাজার থেকে গ্যাসের চালান কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
টেলিগ্রাফের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়তে পারে। তবে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশে কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সিন্ডিকেট পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করছে। গত রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ আতঙ্কে জ্বালানি মজুত করছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন জানান, সীমিত সরবরাহের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে এবং ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা কর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছেন।
শফিকুল আলমের মতে, সরকারকে অবিলম্বে জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এনএন/ ২ এপ্রিল ২০২৬









