দক্ষিণ এশিয়ার নিরিখে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান ও উত্তরণের উপায়

ঢাকা, ৩১ মার্চ – দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষাকে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সরকার সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বিশ্বের এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। মূলত দীর্ঘ ইতিহাস ও দ্বন্দ্বে ঘেরা একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করে।
তাই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরা সম্ভব। একটি অধ্যয়নের ক্ষেত্র হিসেবে শিক্ষা মানুষের অভ্যন্তরীণ গুণাবলী, আনন্দ এবং দক্ষতার বিকাশ ঘটায়। অক্সফোর্ড অ্যাডভান্সড লার্নার্স ডিকশনারি অনুযায়ী শিক্ষা হলো শিশু ও তরুণদের প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনার মাধ্যমে জ্ঞান প্রদান এবং দক্ষতা বিকাশ। ওয়েবস্টারের মতে শিক্ষা হলো শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া। সার্বিকভাবে শিক্ষাকে জ্ঞান, দক্ষতা বা চরিত্র বিকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এর মধ্যে সাধারণ, বৃত্তিমূলক বা কারিগরি, মাদ্রাসা এবং উন্মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা এই তিন স্তরে বিভক্ত। শিক্ষানীতি ২০১০ অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। মাধ্যমিক শিক্ষা তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত যথা জুনিয়র সেকেন্ডারি বা ষষ্ঠ থেকে অষ্টম, মাধ্যমিক বা নবম থেকে দশম এবং উচ্চ মাধ্যমিক বা একাদশ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি। দশম শ্রেণির শেষে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট এবং দ্বাদশ শ্রেণির শেষে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে চার বছর মেয়াদি স্নাতক এবং এক বা দুই বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এমফিল এবং পিএইচডি হলো উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান ধারাগুলো হলো সাধারণ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি বা বৃত্তিমূলক শিক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকি করে থাকে। ডক্টর এ এন এম এহসানুল হক মিলন এবং ববি হাজ্জাজ এই দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত। বাংলাদেশের মূল পাঠ্যক্রম বাংলা বা ইংরেজি সংস্করণে পড়ানো হয়। ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এর মাধ্যমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
দেশটিতে এখন নতুন কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে। ভারতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পর স্নাতক প্রোগ্রাম সাধারণত তিন থেকে চার বছর এবং স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম দুই থেকে আট বছর মেয়াদি হয়ে থাকে। পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থাও প্রাক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। সেখানে স্নাতক ডিগ্রি দুই থেকে চার বছর মেয়াদি। শ্রীলঙ্কার শিক্ষা ব্যবস্থায় ১৩ বছর মেয়াদি বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদান করা হয় যা তিনটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নেপালের শিক্ষা ব্যবস্থায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা চালু রয়েছে। ভুটানের শিক্ষা ব্যবস্থায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
আফগানিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে গভীর সংকটের মুখে রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। মালদ্বীপের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং বৃত্তিমূলক বা উচ্চশিক্ষা স্তরে বিভক্ত। ২০২০ সালের সাধারণ জ্ঞান সূচক বা জিকেআই অনুযায়ী ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল তলানিতে। এই সূচকে সুইজারল্যান্ড শীর্ষে এবং যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় স্থানে ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় বাংলাদেশ ৬৯তম স্থানে রয়েছে যা তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক। তবে উচ্চশিক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯তম যা উগান্ডা এবং বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলোর চেয়েও নিচে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বাংলাদেশ ৯৬তম স্থানে অবস্থান করছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অর্থনীতিতেও বাংলাদেশের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। সাধারণ সক্ষম পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। শিক্ষা বাজেট এবং মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপি বিশ্লেষণে দেখা যায় ৩৯টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শিক্ষায় সবচেয়ে কম বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
ইউনেস্কো জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং বাজেটের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৯ থেকে ২ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ১০ বছর বয়সী ৩৮ শতাংশ বাংলাদেশি শিশু একটি সহজ বাক্যও পড়তে বা লিখতে পারে না।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি এবং মানব উন্নয়ন সূচকেও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। টাইমস হায়ার এডুকেশনের ২০২৫ সালের বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম ৮০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই। ইউজিসি চেয়ারম্যান এস এম এ ফয়েজ বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি শিক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি, মেধাবীদের শিক্ষকতায় উৎসাহ প্রদান এবং গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাজারের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সমন্বয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, বৈষম্য দূরীকরণ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে এই অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব।
এ এম/ ৩১ মার্চ ২০২৬









