মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ প্রণালির সংকট: বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব

তেহরান, ২৯ মার্চ – ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম হরমুজ প্রণালি। পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক এই পথ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন বলা হয়। এই প্রণালির উত্তরে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান অবস্থিত। পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া তেলের একটি বিশাল অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পৌঁছায়।

তাই এর গুরুত্ব কেবল ভৌগোলিক নয়, অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অপরিসীম। হরমুজ প্রণালি কোনো কৃত্রিম জলপথ নয়, এটি প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল। লক্ষাধিক বছর আগে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোর গতিশীলতার কারণে আরবীয় এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষ ঘটে। এর ফলে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে একটি সরু জলপথ তৈরি হয়। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পথ অত্যন্ত নির্দিষ্ট ও সংকীর্ণ। পারস্য উপসাগর থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো নির্দিষ্ট লেনের মাধ্যমে চলাচল করে। এই প্রণালির প্রকৃত গুরুত্ব শুরু হয় আধুনিক যুগে তেল আবিষ্কারের পর

। মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তেলভান্ডার থেকে উৎপাদিত তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথে সরবরাহ হয়। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। তেলের মূল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, কুয়েত এবং কাতার। চীন, ভারত, জাপান, সাউথ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং বাংলাদেশ এই পথে প্রয়োজনের বেশির ভাগ তেল আমদানি করে থাকে। কোনো কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়।

ইরান প্রণালির উত্তর উপকূলে অবস্থান করে এবং দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই পথকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে উন্মুক্ত রাখার পক্ষে। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি এই প্রণালির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হওয়ায় তারা চায় পথটি নিরাপদ থাকুক। জ্বালানি তেলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা সাম্প্রতিক হরমুজ প্রণালি সংকট থেকে স্পষ্ট। সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে এই প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারেও। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংকটে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় মোট জ্বালানির ৯৫ শতাংশ আমদানি নির্ভর এবং মোট তেলের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কাতার থেকে হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে। মূলত ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আমদানি করা হয় যা পরে ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে শুধু তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির শিরায় রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

হরমুজ প্রণালি এক মাস বন্ধ থাকলে সরাসরি তেলের সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হবে এবং দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা দেবে। প্রথম ধাক্কা আসবে বিদ্যুৎ খাতে, কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় বড় আঘাত আসবে পরিবহন খাতে। ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হবে।

বর্তমান যুদ্ধের কারণে এই প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি বিকল্প রুট বিবেচনা করছে এবং তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বিলম্ব হচ্ছে। ইরান বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তাদের ওপর আক্রমণ হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিকল্প শক্তির উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।

এস এম/ ২৯ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language