মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ: চরম অস্থিরতায় বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজার

তেহরান, ২৭ মার্চ – টানা চার সপ্তাহ ধরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের অব্যাহত হুমকি এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার আশঙ্কায় বর্তমানে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। এই গভীর জ্বালানিসংকট নিরসনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করেছেন।

তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় চলাচলের ব্যবস্থার কথা বলা হলেও বাস্তবে এই অঞ্চলে ইরান এখনো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ভৌগোলিক অবস্থান এবং ইরানের অপ্রথাগত যুদ্ধকৌশল যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তির জন্য এই জলপথকে সামরিকভাবে সুরক্ষিত করা কঠিন করে তুলেছে। সস্তা ড্রোন ও সমুদ্র মাইনের ব্যবহার করে ইরান খুব সহজেই এই প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। আধুনিক নৌবাহিনীগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছে ইরান।

গত ২৩ মার্চ লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয় অন্তত দুটি বড় জাহাজ নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পেতে ইরানকে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করেছে। ইরানি কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করেছেন যে নির্দিষ্ট কিছু ট্যাঙ্কারের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য তারা এই ধরনের ফি আদায় অব্যাহত রাখবেন। এই অচলাবস্থা নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো স্পষ্ট সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরান তার কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখার নীতি বজায় রেখেছে।

সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির পাশাপাশি সারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকটের আশঙ্কাও প্রবল হচ্ছে। বর্তমানে চলমান সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নজিরবিহীন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২৭ মার্চের তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৭ ডলারের আশপাশে অবস্থান করছে। মাসের শুরুর দিকে সংঘাত চরমে পৌঁছালে এই দাম ১১৯ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। অন্যদিকে মার্কিন তেলের মানদণ্ড ডব্লিউটিআই ক্রুড বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।

সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এক মাসেই তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে তেলের এই চড়া দামের মূল কারণ হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা। দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের আশঙ্কায় গোল্ডম্যান স্যাকস এবং জেপি মরগানের মতো সংস্থাগুলো পূর্বাভাস দিয়েছে যে সংকট না মিটলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে দেওয়া আলটিমেটামের সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়িয়েছেন। কয়েকটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি মেলায় বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিলেও বিনিয়োগকারীরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে ৬ এপ্রিলের পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে আছেন। এই সময়ের মধ্যে কোনো স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান না এলে জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধরনের ধস বা উল্লম্ফনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এস এম/ ২৭ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language