
যুক্তরাজ্যের উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শহর চেস্টার (Chester)। শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস ও রাজকীয় ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই শহরের ৮০৮তম লর্ড মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন শিরিন আক্তার। প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং ব্রিটেনে বসবাসরত সমগ্র বাঙালি কমিউনিটির জন্য এক গৌরবময় মাইলফলক।
শিরিন আক্তারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা সিলেটে। তবে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি কাটিয়েছেন যুক্তরাজ্যে, যেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে তার পেশাগত ও সামাজিক পরিচয়। তার বাবা প্রয়াত আব্দুল মজিদ ছিলেন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের পেয়ারপুর গ্রামের বাসিন্দা। পরিবার থেকেই তিনি সমাজসেবা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পাঠ গ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি তিনি একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রবাসে বসবাস করেও তিনি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে লালন ও উপস্থাপন করে চলেছেন।
শিরিন আক্তারের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি ছিল ধীর, ধারাবাহিক এবং পরিশ্রমনির্ভর। ২০২৩ সালে তিনি লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে চেশায়ার ওয়েস্ট অ্যান্ড চেস্টার কাউন্সিলের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তার নির্বাচনী এলাকা ছিল আপটন। নির্বাচনের পর থেকেই তিনি স্থানীয় কমিউনিটির উন্নয়ন, বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান এবং নারী ক্ষমতায়ন বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তার এই নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ডেপুটি লর্ড মেয়র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে তাকে লর্ড মেয়রের আসনে পৌঁছানোর পথ সুগম করে।
ব্রিটেনে ‘লর্ড মেয়র’ পদটি অত্যন্ত সম্মানজনক এবং মূলত আলংকারিক হলেও এর সামাজিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি শহরের ‘ফার্স্ট সিটিজেন’ হিসেবে বিবেচিত হন। চেস্টারের লর্ড মেয়র পদটির সূচনা ১২৩৮ সালে, যা শহরটির দীর্ঘ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। সেই ধারাবাহিকতায় শিরিন আক্তার প্রথম বাঙালি হিসেবে এই পদে অধিষ্ঠিত হলেন। তিনি কাউন্সিলের সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে চেস্টার শহরের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে ব্রিটিশ ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার প্রতিফলন ঘটে।
শিরিন আক্তার প্রমাণ করেছেন যে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় অক্ষুণ্ণ রেখেও মূলধারার রাজনীতিতে শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব। দায়িত্ব গ্রহণের পর তরুণদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তার বার্তায় উঠে এসেছে নেতৃত্বের গভীর তাৎপর্য। তার মতে, নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার বিষয় নয়, এটি সমাজসেবার একটি দায়িত্বশীল সুযোগ। তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। নিজেদের শিকড়কে ধারণ করেই বিশ্বনাগরিক হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে।”
লর্ড মেয়র হিসেবে শিরিন আক্তার ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দাতব্য উদ্যোগের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করার অঙ্গীকার করেছেন। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, গৃহহীন মানুষের সহায়তা এবং নারী শিক্ষার প্রসারে তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলোতে তার কার্যকর উদ্যোগ স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
শিরিন আক্তার কেবল একজন লর্ড মেয়র নন, তিনি পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তার এই অর্জন প্রমাণ করে, সীমান্ত পেরিয়েও স্বপ্নের বিস্তার থেমে থাকে না। এই বিজয় ব্রিটেনের মাটিতে প্রতিটি বাঙালির আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। তার পথ ধরে ভবিষ্যতে আরও অনেক বাঙালি নারী সাহস, যোগ্যতা ও নেতৃত্বের শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসবে, এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।
তথ্যসূত্র:
Cheshire West and Chester Council (২২ মে, ২০২৪)
BBC News (২৩ মে, ২০২৪)
Local Government UK (মে, ২০২৪)









