বান্দরবান

ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের ঢল, প্রাণ ফিরে পেয়েছে বান্দরবানের পর্যটন শিল্প

বান্দরবান, ২৫ মার্চ – ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পাহাড়ি জেলা বান্দরবান। টানা ছুটির পঞ্চম দিনেও পর্যটকদের এই উপচে পড়া ভিড় অব্যাহত রয়েছে। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলো ইতিমধ্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে।

মালিক সমিতির নেতাদের তথ্যমতে, আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত এখানকার বেশিরভাগ আবাসন প্রতিষ্ঠানের অগ্রিম বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। এবারের পর্যটন মৌসুমে পাহাড়ে অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের প্রতি মানুষের বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলবদ্ধভাবে অসংখ্য বাইকার, ট্রেকার এবং তরুণ অভিযাত্রীরা বান্দরবানের দুর্গম ও নৈসর্গিক স্থানগুলোতে ছুটে আসছেন। পরিচিত পর্যটন কেন্দ্রগুলোর গণ্ডি পেরিয়ে ভ্রমণপিপাসুরা এখন প্রকৃতির গভীরে প্রবেশ করছেন।

বিশেষ করে রুমার বগালেক, দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং, থানচির নাফাখুম ও অমিয়াখুম জলপ্রপাত, রোয়াংছড়ির দেবতাখুম, শীলবান্ধা ঝরনা, লামার ম্যারিঞ্জা ও সূকিয়া ভ্যালি এবং আলীকদমের মারাইংতং চূড়া ও আলীসুরঙ্গের মতো স্থানগুলো পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ি পথ, ঝরনা এবং মেঘে ঢাকা চূড়াগুলো রোমাঞ্চপ্রেমীদের জন্য এক ভিন্নমাত্রার অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। জেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র নীলাচলে ঘুরতে আসা খুলনার পর্যটক সবিতা রাণী গুপ্ত জানান, তারা সপরিবারে প্রায় ৩৫ জনের একটি দল নিয়ে প্রথমবারের মতো বান্দরবান এসেছেন।

এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং স্থানীয়দের আন্তরিকতায় তারা মুগ্ধ। এছাড়া সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ উন্নত বলে তিনি উল্লেখ করেন। নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি জানান, বান্দরবানের পরিবেশ অত্যন্ত নিরাপদ এবং তারা এখানে নিশ্চিন্তে স্বর্ণালংকার পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পাশাপাশি শত শত মোটরসাইকেল আরোহী দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দলবেঁধে বান্দরবানে আসছেন।

থানচি বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা বাইকার মো. রাশেলের সঙ্গে। তিনি জানান, তাদের ছয় সদস্যের দল লামা ও আলীকদমের বিভিন্ন স্থান ঘুরে থানচির ডিম পাহাড় সড়ক দিয়ে নিরাপদে বান্দরবান শহরে প্রবেশ করেছে। তবে একই দলের সদস্য মো. ইমন জানান, অগ্রিম বুকিং না থাকায় আবাসন সংকটের কারণে তাদের কিছু স্থান ভ্রমণ অসম্পূর্ণ রেখেই ফিরে যেতে হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা পোশাকে ও সাদা পোশাকে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ বান্দরবান রিজিয়নের পুলিশ পরিদর্শক মোঃ ফরিদ উদ্দিন খাঁন জানান, প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্রে আলাদা দল কাজ করছে এবং জরুরি প্রয়োজনে সহায়তার জন্য বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ নম্বর সম্বলিত বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় ট্রেকিংয়ের জন্য অভিজ্ঞ ট্যুরিস্ট গাইডরা পর্যটকদের পথনির্দেশনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বান্দরবানের পর্যটন খাত পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দ্যা ভেকোশনী রিসোর্টের মালিক বিশ্বজিত দাশ বাপ্পা জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী আসছেন, যা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

জেলা হোটেল মোটেল রিসোর্ট ও পরিবহন মালিক সমিতি জানিয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পর্যটক বান্দরবানে আসছেন। গত পাঁচ দিনে প্রায় ৭০ হাজার পর্যটক ভ্রমণ করেছেন এবং আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত এই সংখ্যা দেড় থেকে দুই লাখে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলার হোটেল রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জসিম উদ্দিন জানান, ২০২১ সালের পর নানা কারণে পর্যটন খাত যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, এবারের পর্যটক সমাগম তা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা হয়রানি রোধে জেলা প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পর্যটকের এই বিপুল আগমন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে।

এ এম/ ২৫ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language