শাহপরীর দ্বীপে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়: পাহাড়, নদী ও সাগরের অপূর্ব মেলবন্ধন

কক্সবাজার, ২৪ মার্চ – একদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি এবং অন্যদিকে সবুজে ঘেরা পাহাড়ের অনন্য প্রাকৃতিক মেলবন্ধন উপভোগ করতে কক্সবাজারের টেকনাফ থানাধীন শাহপরীর দ্বীপে ভ্রমণপ্রেমীদের ঢল নেমেছে। ছুটির আমেজে সীমান্তঘেঁষা এই জনপদটি এখন অসংখ্য পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার বিকেলে শাহপরীর দ্বীপ জেটি এলাকায় গিয়ে নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। আগত পর্যটকদের বেশিরভাগই জেটির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নাফ নদীর ওপারে অবস্থিত মিয়ানমারের রাখাইন পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেটির একটি বড় অংশ নদীর জলের ওপর নির্মিত হওয়ায় সেখানে দাঁড়ালে দর্শনার্থীদের মনে হয় যেন তারা সরাসরি নাফ নদীর বুকেই ভাসছেন।
এই জেটির পশ্চিম দিকে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে সারিবদ্ধ নৌকা এবং পূর্ব দিকে রয়েছে নাফ নদীর পাড়। এই দুইয়ের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে একইসঙ্গে সমুদ্র, নদী এবং পাহাড়ের অপূর্ব সমন্বয় উপভোগ করার সুযোগ পান পর্যটকরা। জেলেপল্লি, মাছ ধরার সারি সারি ট্রলার এবং নবগঠিত চর মিলিয়ে পুরো এলাকাটি যেন একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক চিত্রপটে পরিণত হয়েছে।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের আবছায়াও দেখা যায়। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের উপজেলা টেকনাফে প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় রূপ খুব সহজেই সবার নজর কেড়ে নেয়। এখানে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল, পাহাড়ের সবুজ সমারোহ এবং জেলেদের জলনির্ভর জীবনযাপন সবকিছু মিলিয়ে পর্যটকদের এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা প্রদান করে। অনেক দর্শনার্থী মাছ শিকার করেন আবার অনেকে সাম্পানে চড়ে নদীতে ঘুরে বেড়ান।
স্থানীয় জেলেদের এই জীবনধারাও দর্শনার্থীদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ ও পূর্ব অংশে অবস্থিত জালিয়াপাড়া গ্রামটি মূলত জেলে সম্প্রদায়ের বসতি হিসেবে সুপরিচিত। এখানকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন পুরোপুরিভাবে সমুদ্র এবং মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। তাদের সহজ সরল জীবন এবং প্রকৃতির সাথে গভীর ঘনিষ্ঠতা পর্যটকদের মনে বিশেষ মুগ্ধতা ছড়ায়। এছাড়া রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের কাছে মিয়ানমার সীমান্ত এবং নাফ নদী বর্তমানে অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
ছুটির অবসরে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে এই সীমান্ত এলাকাটি ঘুরে দেখার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক পর্যটক জানান যে সীমান্তঘেঁষা এই এলাকা তাদের জন্য একেবারেই নতুন এবং রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতা। নাফ নদী, ছোট ছোট নৌকা এবং পাহাড়ঘেরা মনোরম পরিবেশ শিশুদেরও বেশ আনন্দ দিচ্ছে।
একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে আসা অপর এক দর্শনার্থী জানান যে শহরের কোলাহল থেকে দূরে এমন শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশ তাদের মনে অনাবিল প্রশান্তি এনে দেয়। নাফ নদীর স্বচ্ছ জল এবং ওপারের পাহাড়ি দৃশ্য মিলিয়ে শাহপরীর দ্বীপ এলাকাটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্রই নয় বরং ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জেটির শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে খুব কাছ থেকে এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব।
পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বদা সক্রিয় রয়েছেন। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশের নিয়মিত টহল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে সীমান্ত উপজেলা হওয়ায় টেকনাফ ঘুরে দেখার ব্যাপারে অনেকের আগ্রহ থাকলেও সময়ের অভাবে তা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে বর্তমানে নাফ নদীর জেটিগুলো পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং প্রতিদিন এখানে দর্শনার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রকৃতির এই মনোরম সান্নিধ্যে কাটানো সময়গুলো দর্শনার্থীদের কাছে এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে উঠছে যা তাদের বারবার শাহপরীর দ্বীপের অনন্য সৌন্দর্যের টানে ফিরিয়ে আনছে।
এ এম/ ২৪ মার্চ ২০২৬









