
ম্যানহাটনের এক অভিজাত হোটেল। ঝলমলে ঝাড়বাতির নিচে বাংলাদেশি কমিউনিটির বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। সামনের সারিতে স্যুট পরা এক ব্যক্তি, হাতে দামী ঘড়ি, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি। মানুষ এগিয়ে এসে হাত মেলাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে। তার পরিচয়, তিনি একজন সমাজসেবী, সম্মানিত অতিথি। সবকিছু ঠিকই আছে। শুধু এক জায়গায় চোখ থমকে যায়, তার ডান পায়ের দিকে।ভিড়ের ভেতরেও যদি কেউ একটু মনোযোগ দিত, দেখত তার ডান পায়ের মোজার উপর একটি অস্বাভাবিক স্ফীতি। প্যান্টের নিচটা সামান্য বেশি ফোলা। আভিজাত্যের ঠিক তলায় লুকিয়ে আছে কালো রঙের এক বন্ধনী। এটি অ্যাঙ্কেল মনিটর।
এটি কোনো অলঙ্কার নয়। এটি মুক্ত মানুষের পায়ে থাকে না। এটি সেই চিহ্ন, যা বলে দেয় এই মানুষটির ওপর নজর আছে। আদালত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বা অভিবাসন বিভাগ তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখেনি। বাইরে থেকে তিনি অতিথি, ভেতরে তিনি নজরদারির অধীন। এটি দেয়াল নেই এমন কারাগার, যা কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতরে এই দৃশ্য আর নতুন নয়। কারও গোড়ালিতে সরাসরি মনিটর, কারও ফোনে নিয়মিত চেক ইন, কারও ক্ষেত্রে ঘন ঘন রিপোর্টিং। পদ্ধতি আলাদা হলেও সত্য একটাই, তাদের স্বাধীনতা শর্তে বাঁধা। কেউ মামলার আসামি, কেউ সাজা শেষে শর্তে, কেউ অভিবাসন মামলায় নজরদারির মধ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যখন কাউকে জেলখানায় রাখতে চায় না এবং সম্পূর্ণ মুক্তও রাখতে চায় না, তখনই ইলেকট্রনিক মনিটরিং বেছে নেয়। অভিবাসন ব্যবস্থায় ICE যে Alternatives to Detention বা ATD প্রোগ্রাম চালায়, সেখানে অ্যাঙ্কেল মনিটর, স্মার্টফোন অ্যাপ, এমনকি ওয়্যারেবল ডিভাইসও ব্যবহার করা হয়। লক্ষ্য একটাই, ডিটেনশনের খরচ কমিয়ে নজরদারি বজায় রাখা।
এই মনিটরিং কয়েকভাবে কাজ করে। প্রথমত, জিপিএস ধরে মানুষটির অবস্থান জানা হয়। দ্বিতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঠিকানায় থাকার শর্ত থাকে, কখনও বাড়ির ভেতরে থাকতে হয়, কখনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরতে হয়। তৃতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে অ্যালকোহল মনিটরিংয়ের মতো আলাদা প্রযুক্তিও যুক্ত থাকে, যা অবস্থানের পাশাপাশি আচরণগত তথ্য
নজরদারিতে আনার চেষ্টা করে। অর্থাৎ, এই ডিভাইস শুধু পা নয়, মানুষের চলাফেরা আর অভ্যাসকেও নিয়ন্ত্রণে আনে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটা হলো, এই শেকল মানুষকে সমাজের চোখে দুই রকম করে তোলে। একদল তাকে দেখে করুণা করে, আরেকদল তাকে দেখে ভয় পায়। কিন্তু আসল সত্য হলো, দুটোই অনির্ভরযোগ্য। কারণ মনিটর থাকা মানে রাষ্ট্র তাকে নজরদারির তালিকায় রেখেছে, কিন্তু কেন রেখেছে তা অনেক সময় আশপাশের মানুষ জানে না।
যারা সত্যিই বিপজ্জনক, তারা সাধারণত নিজেদের বিপজ্জনক বলে পরিচয় দেয় না। তারা সুন্দর সুন্দর কথা বলে, অনুষ্ঠানে আসে, ধর্মীয় বা সামাজিক জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়, অনুদান দেয়, হাসে, ছবি তোলে, মানুষকে কাছে টানে। এই অজানাটাই অপরাধীদের জন্য সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেই মনে করেন, জেলখানার বদলে বাড়িতে থাকার সুযোগ রাষ্ট্র দয়া করে দিচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার এই দেয়াল নেই এমন বন্দিত্ব এখন বিশাল বাণিজ্য। একে বলা হয় “User Funded Monitoring”। অর্থাৎ, যার পায়ে ডিভাইস পরানো হয়েছে, তার ফি অনেক সময় তাকেই গুনতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক এলাকায় একজন অভিযুক্ত বা তদারকির আওতায় থাকা ব্যক্তিকে দৈনিক ৩ ডলার থেকে ৩৫ ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হয়, সঙ্গে ১০০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত সেট আপ চার্জও যোগ হয়।সবচেয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে চার্জিং। ব্যবহারকারীকে নিয়মিত ডিভাইস চার্জ দিতে হয়, অনেক সময় প্রতিদিনই। কোথাও কোথাও চার্জ ধরে রাখার সময় কম, তাই দীর্ঘক্ষণ চার্জ দিতে হয়। বিদ্যুৎ লাইনের কাছাকাছি বসে থাকা যেন দৈনিক বাধ্যতামূলক হাজিরা। ব্যাটারি শেষ হওয়া মানেই শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, অনেকের মনে তখন ভয় জাগে, এটাকে নিয়মভঙ্গ হিসেবে দেখা হবে কি না।
যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বহু মানুষের কাছে এই মনিটর এক ধরনের মানসিক ভার। বিশেষ করে যারা মেক্সিকো বা কানাডা সীমান্ত পেরিয়ে এসে আশ্রয় চান, তাদের একটি অংশকে ডিটেনশনের বদলে ATD তে রাখা হয়। সাম্প্রতিক রিপোর্টিংয়ে প্রায় এক লক্ষ আশি হাজারের মতো মানুষের কথা এসেছে। তারা বাইরে থাকেন, কিন্তু তাদের দৈনন্দিন চলাফেরা শর্ত আর নজরদারির নিয়মে বাঁধা।
টেক্সাসের এক ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার থেকে ছাড়া পাওয়া এক বাংলাদেশি যুবকের নাম রিয়াজ, নামটি ছদ্মনাম। রিয়াজ যখন নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে পা রাখেন, তার মনে ছিল কাজের স্বপ্ন, নতুন জীবনের পরিকল্পনা। কিন্তু গোড়ালিতে বাঁধা মনিটর তাকে বারবার মনে করিয়ে দিত, তার জীবন এখন শর্তে বাঁধা।একদিন মসজিদে নামাজে সেজদায় যাওয়ার সময় রিয়াজের প্যান্টের নিচ থেকে ডিভাইসটি সামান্য বেরিয়ে আসে। পাশের একজন মুসল্লির চোখ আটকে যায়, আরেকজনও বুঝে ফেলে। যদিও কেউ কিছু বলেনি, কিন্তু দৃষ্টি অনেক কথা বলে দেয়। রিয়াজের বুকের ভেতর কাঁপুনি ওঠে। সে বুঝতে পারে, এই যন্ত্র কেবল নজরদারি নয়, এটি মানুষের সামাজিক অবস্থানও বদলে দেয়। মানুষ প্রশ্ন তোলে, আপনি কী করেছেন।
এই মনিটরিং এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক প্রবণতা। যুক্তরাজ্যেও নানা ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ট্যাগ ব্যবহারের পরিসর বেড়েছে। সেখানে আশ্রয়প্রার্থীদের জিপিএস ট্যাগিং নিয়ে দেশটির তথ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা সতর্ক করেছে। কানাডায়ও ইলেকট্রনিক মনিটরিংয়ের উপস্থিতি আছে, তবে অভিবাসন ব্যবস্থায় তা সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ও অভিবাসন ব্যবস্থায় অ্যাঙ্কেল মনিটর হয়তো ডিটেনশনের ভিড় কমিয়েছে, খরচও কমিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি তৈরি করেছে এমন এক কারাগার, যার দেয়াল দেখা যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে ICE তাদের নজরদারি আরও কড়াকড়ি করার নির্দেশনা দিয়েছে বলে আলোচনা আছে। এর মানে অনেক ক্ষেত্রে মনিটরিংয়ের শর্ত বাড়তে পারে, জিপিএস ট্র্যাকিং আরও কঠোর হতে পারে, এবং চেক ইন আরও ঘন ঘন হতে পারে।







